আদালতে যাওয়ার আগে বা কোনো মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে এফিডেভিট, ডিক্রি, রিট, ভাকালতনামার মতো শব্দগুলো বারবার কানে আসে। এই শব্দগুলোর সঠিক অর্থ না জানলে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা বা কাগজপত্র বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে মামলা ও আদালতের কাগজপত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো।
মামলা শুরুর কাগজপত্র সংক্রান্ত শব্দ
- প্লেইন্ট (আরজি): দেওয়ানি মামলা শুরু করার জন্য বাদী কর্তৃক আদালতে দাখিল করা লিখিত অভিযোগপত্র, যাতে দাবির বিবরণ ও চাওয়া প্রতিকার উল্লেখ থাকে।
- এজাহার (এফআইআর): ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে থানায় দায়ের করা প্রথম তথ্যবিবরণী, যা পুলিশি তদন্তের ভিত্তি তৈরি করে।
- লিখিত জবাব: দেওয়ানি মামলায় বিবাদীর পক্ষ থেকে বাদীর দাবির জবাবে দাখিল করা লিখিত বক্তব্য।
- এফিডেভিট (হলফনামা): কোনো তথ্য সত্য বলে শপথপূর্বক লিখিতভাবে নিশ্চিত করা দলিল, যা আদালতে প্রমাণ বা সমর্থন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- ভাকালতনামা: মক্কেল কর্তৃক তাঁর পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য একজন আইনজীবীকে ক্ষমতা অর্পণের লিখিত দলিল।
- জামানতনামা (বেইল বন্ড): জামিনে মুক্তির শর্ত হিসেবে আসামি বা তাঁর জামিনদার কর্তৃক আদালতে দাখিল করা লিখিত অঙ্গীকারনামা।
আদালতের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত শব্দ
- সমন: আদালতে হাজির হওয়ার জন্য কোনো পক্ষ বা সাক্ষীকে পাঠানো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা।
- ওয়ারেন্ট: কাউকে গ্রেপ্তার করার বা কোনো স্থান তল্লাশির জন্য আদালতের লিখিত অনুমোদন।
- হাজিরা: মামলার নির্ধারিত তারিখে পক্ষ বা আইনজীবীর আদালতে উপস্থিত হওয়া।
- মুলতবি (Adjournment): কোনো কারণে মামলার শুনানি পরবর্তী তারিখে স্থগিত করা।
- জেরা: বিপক্ষের আইনজীবী কর্তৃক সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই করার প্রক্রিয়া।
- এক্স-পার্টি: বিবাদী বা প্রতিপক্ষ অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় একতরফাভাবে মামলার শুনানি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
আদেশ ও রায় সংক্রান্ত শব্দ
- আদেশ (Order): মামলার কোনো পর্যায়ে আদালতের দেওয়া নির্দেশনা, যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নাও হতে পারে।
- রায় (Judgment): মামলার মূল বিষয়বস্তুর ওপর আদালতের যুক্তিসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
- ডিক্রি: দেওয়ানি মামলায় রায়ের ভিত্তিতে পক্ষগুলোর অধিকার ও দায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণকারী আদালতের চূড়ান্ত আদেশ।
- ডিফল্ট ডিক্রি: বিবাদী নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে বা হাজির না হলে বাদীর পক্ষে দেওয়া ডিক্রি।
- স্থগিতাদেশ (Stay Order): কোনো আদেশ, রায় বা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আদালতের নির্দেশ।
- নিষেধাজ্ঞা (Injunction): কোনো পক্ষকে নির্দিষ্ট কাজ করা থেকে বিরত রাখতে বা করতে বাধ্য করতে আদালতের দেওয়া আদেশ।
প্রতিকার ও পর্যালোচনা সংক্রান্ত শব্দ
- আপিল: নিম্ন আদালতের রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ পক্ষ কর্তৃক উচ্চতর আদালতে পুনর্বিবেচনার জন্য দায়ের করা আবেদন, যেখানে মামলার তথ্য ও আইন উভয় দিক থেকে পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে।
- রিভিশন: নিম্ন আদালতের কার্যক্রমে আইনগত ত্রুটি বা এখতিয়ার-বহির্ভূত সিদ্ধান্ত থাকলে তা সংশোধনের জন্য উচ্চতর আদালতে করা আবেদন, যা আপিলের চেয়ে সীমিত পরিসরের।
- রিভিউ: একই আদালত কর্তৃক নিজের দেওয়া রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন, সাধারণত সুস্পষ্ট ত্রুটি থাকলে।
- রিট পিটিশন: মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে সরাসরি দায়ের করা সাংবিধানিক প্রতিকারমূলক আবেদন।
- তামাদি (Limitation): কোনো মামলা বা আবেদন দায়েরের জন্য আইনে নির্ধারিত সময়সীমা, যা পার হয়ে গেলে অধিকার থাকা সত্ত্বেও সাধারণত মামলা করার সুযোগ থাকে না।
- কোর্ট ফি: মামলা বা আবেদন দাখিলের সময় আদালতে পরিশোধযোগ্য নির্ধারিত সরকারি ফি।
কেন এই পরিভাষাগুলো জানা দরকার
একজন সাধারণ মানুষ আইনজীবী নন, তবে নিজের মামলার কাগজপত্রে কী লেখা আছে তা মোটামুটি বুঝতে পারলে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয় এবং প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কী ঘটছে তা অনুধাবন করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে আপিল, রিভিশন ও রিভিউয়ের মধ্যে পার্থক্য না বোঝার কারণে অনেকে ভুল প্রতিকার বেছে নেন, যা সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট করতে পারে। তেমনি তামাদির মেয়াদ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সঠিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও অনেকে মামলা করার সুযোগ হারান।
আইনের ধারা কীভাবে পড়বেন ও এর মধ্যে থাকা উপধারা-প্রোভাইসো বুঝবেন, তা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আইনের ধারা কীভাবে পড়বেন ও বুঝবেন: উপধারা, প্রোভাইসো ও ব্যাখ্যার সহজ পদ্ধতি। এই পরিভাষাগুলোর সঙ্গে পরিচিত থাকলে ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ায় আপনি আরও আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারবেন।

মন্তব্যসমূহ (০)