মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোরআনে নির্ধারিত অংশীদারদের (যাবিল ফুরুজ বা sharers) অংশ ভগ্নাংশে বলা আছে: অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ, এক-তৃতীয়াংশ ও এক-ষষ্ঠাংশ। কিন্তু বাস্তবে উত্তরাধিকারীদের নির্দিষ্ট সমন্বয়ে এই ভগ্নাংশগুলো যোগ করলে কখনো তা পুরো সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, আবার কখনো কম থাকে। প্রথম পরিস্থিতির সমাধান আউল (Aul, আনুপাতিক হ্রাস), দ্বিতীয়টির সমাধান রাদ্দ (Radd, উদ্বৃত্ত ফেরত)।
এলএলবির মুসলিম আইন কোর্সে উত্তরাধিকারের হিসাব সবচেয়ে বেশি নম্বরের অংশগুলোর একটি, আর আউল-রাদ্দ এর কেন্দ্রীয় বিষয়। এই লেখায় হানাফি আইনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সুন্নি মুসলিমদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য। স্ত্রী, কন্যা ও মায়ের অংশের মৌলিক নিয়ম আগে পড়ে নিতে পারেন মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে স্ত্রী, কন্যা ও মায়ের সম্পত্তির অংশ লেখায়।
হিসাবের আগে তিনটি প্রাথমিক ধাপ
আউল বা রাদ্দের প্রশ্নে যাওয়ার আগে উত্তরাধিকার বণ্টনের স্বাভাবিক ক্রম মনে রাখা দরকার:
- প্রাথমিক দায় পরিশোধ: মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ (স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরসহ) পরিশোধ এবং বৈধ অসিয়ত (সাধারণত এক-তৃতীয়াংশের সীমার মধ্যে) কার্যকর করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তিই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়।
- উত্তরাধিকারী শনাক্ত ও বঞ্চিতকরণ (হাজব): কে উত্তরাধিকারী, কে নিকটতর উত্তরাধিকারীর উপস্থিতিতে বাদ পড়বেন, তা আগে নির্ধারণ করতে হয়।
- অংশীদার ও অবশিষ্টভোগী আলাদা করা: কারা নির্ধারিত অংশ পাবেন আর কারা অবশিষ্টভোগী (আসাবা বা residuary), তা চিহ্নিত করতে হয়। অবশিষ্টভোগী থাকলে তিনিই অংশীদারদের পর উদ্বৃত্ত পান, তখন রাদ্দের প্রয়োজন হয় না।
আউল (Aul): অংশের যোগফল ১-এর বেশি হলে
নিয়ম
সব অংশীদারের নির্ধারিত অংশ যোগ করে যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি (অর্থাৎ ১-এর বেশি) হলে প্রত্যেকের অংশ আনুপাতিক হারে কমাতে হয়। পদ্ধতিটি হলো: সব ভগ্নাংশকে একটি সাধারণ হরে প্রকাশ করে লবগুলোর যোগফলকেই নতুন হর হিসেবে ধরা। এতে প্রত্যেকের অংশ একই অনুপাতে কমে এবং মোট যোগফল ঠিক ১ হয়।
উদাহরণ ১: স্বামী ও দুই আপন বোন
একজন নারী মারা গেলেন। উত্তরাধিকারী: স্বামী এবং দুই আপন বোন। কোনো সন্তান, পিতা, পিতামহ বা ভাই নেই।
- সন্তান না থাকায় স্বামীর অংশ ১/২।
- দুই বা ততোধিক আপন বোনের সম্মিলিত অংশ ২/৩।
সাধারণ হর ৬ ধরলে: স্বামী ৩/৬, দুই বোন ৪/৬। লবের যোগফল ৩ + ৪ = ৭, যা ৬-এর বেশি। আউলের নিয়মে হর ৬ থেকে বাড়িয়ে ৭ করা হয়।
- স্বামী: ৩/৭
- দুই বোন একত্রে: ৪/৭, অর্থাৎ প্রত্যেকে ২/৭
যাচাই: ৩/৭ + ২/৭ + ২/৭ = ৭/৭ = ১।
উদাহরণ ২: স্বামী, দুই আপন বোন ও মা
আগের উদাহরণে মা-ও জীবিত থাকলে কী হবে? সন্তান নেই, কিন্তু দুই বা ততোধিক ভাইবোন থাকায় মায়ের অংশ ১/৬।
- স্বামী ৩/৬, দুই বোন ৪/৬, মা ১/৬; লবের যোগফল ৮।
- নতুন হর ৮: স্বামী ৩/৮, দুই বোন ৪/৮ (প্রত্যেকে ২/৮ বা ১/৪), মা ১/৮।
উদাহরণ ৩: স্ত্রী, মা ও দুই আপন বোন
একজন পুরুষ মারা গেলেন; রেখে গেলেন স্ত্রী, মা ও দুই আপন বোন। সন্তান, পিতা ও ভাই নেই।
- স্ত্রী ১/৪ (সন্তান নেই), মা ১/৬ (একাধিক বোন আছে), দুই বোন ২/৩।
- সাধারণ হর ১২: স্ত্রী ৩/১২, মা ২/১২, দুই বোন ৮/১২; লবের যোগফল ১৩।
- নতুন হর ১৩: স্ত্রী ৩/১৩, মা ২/১৩, দুই বোন একত্রে ৮/১৩ (প্রত্যেকে ৪/১৩)।
লক্ষ করুন, আউলে স্বামী-স্ত্রীসহ সব অংশীদারের অংশই আনুপাতিক হারে কমে; কেউ বাদ পড়েন না।
রাদ্দ (Radd): অংশ দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত থাকলে
নিয়ম
অংশীদারদের নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তির একটি অংশ উদ্বৃত্ত থাকে এবং কোনো অবশিষ্টভোগী না থাকে, তাহলে সেই উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের কাছে না গিয়ে অংশীদারদের কাছেই তাঁদের অংশের অনুপাতে ফেরত যায়। হানাফি আইনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, অন্য অংশীদার থাকলে স্বামী বা স্ত্রী এই ফেরত অংশ পান না; তাঁদের নির্ধারিত অংশ অপরিবর্তিত থাকে, আর উদ্বৃত্ত অন্য অংশীদারদের মধ্যে ভাগ হয়।
উদাহরণ ৪: মা ও এক কন্যা (স্বামী-স্ত্রী নেই)
একজন মারা গেলেন; রেখে গেলেন মা ও এক কন্যা। আর কোনো উত্তরাধিকারী বা অবশিষ্টভোগী নেই।
- কন্যা ১/২, মা ১/৬ (সন্তান থাকায়)।
- সাধারণ হর ৬: কন্যা ৩/৬, মা ১/৬; যোগফল ৪/৬, উদ্বৃত্ত ২/৬।
- রাদ্দের নিয়মে লবগুলোর যোগফল ৪-কেই নতুন হর ধরা হয়: কন্যা ৩/৪, মা ১/৪।
অর্থাৎ রাদ্দের হিসাব আউলের উল্টো: আউলে হর বাড়ে, রাদ্দে হর কমে।
উদাহরণ ৫: স্ত্রী, মা ও এক কন্যা
এবার একজন পুরুষ রেখে গেলেন স্ত্রী, মা ও এক কন্যা। পিতা, পুত্র, ভাইসহ কোনো অবশিষ্টভোগী নেই।
- স্ত্রীর অংশ ১/৮ (সন্তান থাকায়)। স্ত্রী রাদ্দ পাবেন না, তাই প্রথমে তাঁর অংশ আলাদা করুন: বাকি থাকে ৭/৮।
- বাকি ৭/৮ ভাগ হবে কন্যা ও মায়ের মধ্যে তাঁদের নির্ধারিত অংশের অনুপাতে। কন্যা ১/২ ও মা ১/৬, অর্থাৎ অনুপাত ৩ : ১।
- কন্যা: ৭/৮ × ৩/৪ = ২১/৩২; মা: ৭/৮ × ১/৪ = ৭/৩২।
যাচাই: স্ত্রী ৪/৩২ + কন্যা ২১/৩২ + মা ৭/৩২ = ৩২/৩২ = ১।
এখানে একটি সাধারণ ভুল হলো স্ত্রীকেও আনুপাতিক ফেরতের মধ্যে ধরে ফেলা। তাতে স্ত্রীর অংশ বেড়ে যায় এবং কন্যা-মায়ের অংশ ভুলভাবে কমে।
টাকার অঙ্কে হিসাব
উদাহরণ ৩-এ মোট বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ১৩ লাখ টাকা হলে: স্ত্রী ৩ লাখ, মা ২ লাখ এবং দুই বোন প্রত্যেকে ৪ লাখ টাকা পাবেন। আউল না করলে স্ত্রী ১/৪ হিসেবে ৩ লাখ ২৫ হাজার, মা ১/৬ হিসেবে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার এবং দুই বোন ২/৩ হিসেবে প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা দাবি করতেন, যার যোগফল ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকার বেশি, অর্থাৎ সম্পত্তির চেয়ে বেশি। আউল এই অসম্ভব পরিস্থিতিকে সবার জন্য আনুপাতিক সমাধানে রূপ দেয়।
উদাহরণ ৫-এ সম্পত্তি ৩২ লাখ টাকা হলে: স্ত্রী ৪ লাখ, কন্যা ২১ লাখ এবং মা ৭ লাখ টাকা পাবেন। রাদ্দ না করলে কন্যা ১৬ লাখ ও মা প্রায় ৫ লাখ ৩৩ হাজার টাকা পেতেন, আর প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যেত।
আউলের ঐতিহাসিক উৎস
ইসলামি আইনের ইতিহাসে বলা হয়, স্বামী ও দুই বোনের মতো একটি উত্তরাধিকার-সমস্যায় দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রথম আনুপাতিক হ্রাসের পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যা পরে আউল নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সুন্নি মাজহাবগুলোতে গৃহীত হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এই পদ্ধতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে, এবং শিয়া আইনের অবস্থান অনেকটা সেই মতের কাছাকাছি। পরীক্ষায় এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক-দুই বাক্যে উল্লেখ করলে উত্তর সমৃদ্ধ হয়।
যখন স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই
ধ্রুপদী হানাফি নীতিতে স্বামী-স্ত্রী রাদ্দ পান না। কিন্তু যদি স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া কোনো অংশীদার, অবশিষ্টভোগী বা দূরবর্তী আত্মীয়ও না থাকেন, তখন উদ্বৃত্ত কোথায় যাবে, এ প্রশ্নে পরবর্তী হানাফি আইনবিদ ও উপমহাদেশের আইনি ভাষ্যে উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের কাছে না দিয়ে জীবিত স্বামী বা স্ত্রীকে ফেরত দেওয়ার মত প্রাধান্য পেয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরীক্ষায় এই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি উল্লেখ করতে পারেন, তবে বাস্তব কোনো সম্পত্তি বণ্টনে এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে প্রামাণ্য গ্রন্থ ও আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আউল ও রাদ্দের তুলনা
| বিষয় | আউল | রাদ্দ |
|---|---|---|
| কখন | অংশের যোগফল ১-এর বেশি | অংশের যোগফল ১-এর কম এবং কোনো অবশিষ্টভোগী নেই |
| হিসাব | হর বাড়ানো হয় | হর কমানো হয় বা উদ্বৃত্ত আনুপাতিক ভাগ |
| ফলাফল | সবার অংশ আনুপাতিক হারে কমে | যোগ্য অংশীদারদের অংশ আনুপাতিক হারে বাড়ে |
| স্বামী-স্ত্রী | অন্যদের মতো তাঁদের অংশও কমে | অন্য অংশীদার থাকলে তাঁরা ফেরত অংশ পান না |
শিয়া আইনে ভিন্নতা
শিয়া (ইসনা আশারিয়া) আইনে আউল নীতি গ্রহণ করা হয় না; অংশের যোগফল বেশি হলে ঘাটতি নির্দিষ্ট কিছু উত্তরাধিকারীর, যেমন কন্যা বা বোনদের, অংশ থেকে সমন্বয় করা হয়। রাদ্দের ক্ষেত্রেও স্বামী-স্ত্রীর অধিকার নিয়ে শিয়া আইনের অবস্থান হানাফি আইন থেকে কিছুটা ভিন্ন। পরীক্ষার প্রশ্নে "হানাফি আইন অনুযায়ী" বলা না থাকলে উত্তরের শুরুতে কোন মাজহাব অনুসরণ করছেন তা উল্লেখ করুন।
সাধারণ ভুল
- অবশিষ্টভোগী থাকা সত্ত্বেও রাদ্দ প্রয়োগ: পুত্র, পিতা বা আপন ভাইয়ের মতো অবশিষ্টভোগী থাকলে উদ্বৃত্ত তাঁরাই পান; রাদ্দের প্রশ্ন ওঠে না।
- হাজবের নিয়ম আগে প্রয়োগ না করা: যেমন পুত্র থাকলে ভাইবোনেরা বঞ্চিত হন। বঞ্চিতদের অংশ ধরে হিসাব করলে পুরো উত্তর ভুল হয়।
- মায়ের অংশ ভুল নির্ধারণ: সন্তান বা একাধিক ভাইবোন থাকলে মায়ের অংশ ১/৬, না থাকলে ১/৩ (বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অবশিষ্টের ১/৩)। এই শর্ত না দেখে অংশ ধরা।
- যাচাই না করা: সব অংশ যোগ করে ১ হচ্ছে কি না, শেষে তা মিলিয়ে দেখা উচিত।
পরীক্ষায় উত্তর লেখার কৌশল
- প্রথমে প্রশ্নের তথ্য থেকে উত্তরাধিকারীদের তালিকা করুন এবং কে বঞ্চিত হবেন তা কারণসহ লিখুন।
- প্রত্যেক অংশীদারের অংশ কোন নিয়মে নির্ধারিত হলো, এক লাইনে উল্লেখ করুন।
- সাধারণ হর বের করে যোগফল দেখান এবং আউল বা রাদ্দের প্রয়োজন আছে কি না বলুন।
- সংশোধিত অংশ টেবিল আকারে দিন এবং শেষে যাচাই দেখান।
- প্রশ্নে সম্পত্তির মূল্য দেওয়া থাকলে টাকার অঙ্কে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিসাব করুন।
সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নের সাধারণ উত্তর-কৌশল নিয়ে পড়ুন আইন পরীক্ষায় কেস স্টাডি ও সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর।
অনুশীলনী
নিচের প্রশ্নগুলো সিলেবাসভিত্তিক অনুশীলনী, কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা বছরের পরীক্ষার প্রশ্ন নয়। উত্তর নিজে বের করে উপরের পদ্ধতিতে যাচাই করুন:
- একজন নারী রেখে গেলেন স্বামী, মা ও এক আপন বোন। কোনো সন্তান, পিতা বা ভাই নেই। প্রত্যেকের অংশ নির্ণয় কর। (ইঙ্গিত: স্বামী ১/২, বোন ১/২, মা ১/৩; আউল প্রয়োজন।)
- একজন পুরুষ রেখে গেলেন দুই কন্যা ও মা; আর কেউ নেই। বণ্টন দেখাও। (ইঙ্গিত: রাদ্দ প্রয়োজন।)
- আউল ও রাদ্দের মধ্যে পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা কর।
শেষ কথা
আউল ও রাদ্দ আসলে একটি সহজ ন্যায়ভিত্তিক ধারণার দুই রূপ: সম্পত্তি কম পড়লে সবাই আনুপাতিক হারে কম পাবেন, আর বেশি থাকলে তা যোগ্য অংশীদারদের মধ্যেই ফিরে যাবে। ধাপগুলো ক্রমানুসারে অনুসরণ করলে, বিশেষ করে বঞ্চিতকরণ ও অবশিষ্টভোগী যাচাই আগে করে নিলে, জটিল দেখানো প্রশ্নও নির্ভুলভাবে সমাধান করা যায়। বাস্তব সম্পত্তি বণ্টনে হিসাবের পাশাপাশি ওয়ারিশ সনদ ও নামজারির মতো আইনি ধাপও সম্পন্ন করতে হয়।

মন্তব্যসমূহ (০)