আইনের লেখায় নিজের বলে কিছু দাঁড় করানো তুলনামূলক কঠিন। কারণ যা লিখছেন তার ভিত্তি কোনো আইন, রায়, বই বা প্রবন্ধ। ফলে অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণাপত্র লিখতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ইচ্ছা না থাকলেও plagiarism-এর ফাঁদে পড়েন। আবার কেউ কেউ ভাবেন, আইনের ধারা তো সবার জন্য এক, তাই সেখান থেকে হুবহু তুলে দিলে সমস্যা কী। সমস্যা আছে, তবে তার সমাধানও সহজ—উৎস দেখানো আর নিজের বিশ্লেষণ যোগ করা।
Plagiarism ঠিক কী
অন্যের লেখা, ভাষা, ধারণা, যুক্তি বা গবেষণার ফল উৎস উল্লেখ ছাড়া এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে মনে হয় সেগুলো আপনার নিজের—এটিই plagiarism। এর কয়েকটি রূপ আছে:
- সরাসরি কপি: বই, ওয়েবসাইট বা অন্যের অ্যাসাইনমেন্ট থেকে অনুচ্ছেদ তুলে দেওয়া।
- প্যাচরাইটিং: মূল বাক্যের কাঠামো রেখে কয়েকটি শব্দ সমার্থক দিয়ে বদলে দেওয়া।
- ধারণা চুরি: কোনো লেখকের মৌলিক যুক্তি বা বিশ্লেষণ নিজের ভাষায় লিখে উৎস না দেওয়া।
- অনুবাদ-কপি: ইংরেজি প্রবন্ধ বাক্য ধরে ধরে বাংলায় অনুবাদ করে নিজের বলে জমা দেওয়া।
- নিজের পুরোনো লেখা পুনর্ব্যবহার: আগে জমা দেওয়া লেখা অনুমতি ছাড়া নতুন কোর্সে আবার জমা দেওয়া। অনেক প্রতিষ্ঠানে এটিকেও অসদাচরণ ধরা হয়।
আইনের লেখায় কোনটি plagiarism নয়
আইনের ধারা বা সংবিধানের অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। একইভাবে রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হুবহু তুলে দেওয়াও চলে। শর্ত একটাই—উদ্ধৃতিচিহ্ন বা আলাদা ব্লকে রাখতে হবে, আর কোন আইনের কোন ধারা বা কোন মামলার কোন অংশ, তা স্পষ্ট করে বলতে হবে। "চুক্তি আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী..." লিখে ধারার ভাষা দেওয়া plagiarism নয়। কিন্তু কোনো ভাষ্যকারের লেখা ১০ ধারার ব্যাখ্যা নিজের ভাষা বলে চালিয়ে দেওয়া plagiarism।
সাধারণ জ্ঞানও রেফারেন্সের দাবি রাখে না। যেমন "বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ নিয়ে গঠিত"—এ ধরনের সর্বজনবিদিত তথ্যে ফুটনোট লাগে না।
উদ্ধৃতি, প্যারাফ্রেজ ও সারাংশ: কখন কোনটি
সরাসরি উদ্ধৃতি
যখন মূল ভাষাটাই গুরুত্বপূর্ণ, তখন সরাসরি উদ্ধৃতি দিন। যেমন আইনের ধারা, রায়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাক্য বা সংজ্ঞা। উদ্ধৃতি ছোট রাখুন; পুরো লেখা উদ্ধৃতিতে ভরে গেলে আপনার নিজের বিশ্লেষণ হারিয়ে যায়।
প্যারাফ্রেজ
মূল অর্থ ঠিক রেখে পুরোপুরি নিজের ভাষা ও নিজের বাক্য কাঠামোয় লেখাকে প্যারাফ্রেজ বলে। কৌশল হলো, মূল লেখা পড়ে বন্ধ করে রাখুন, তারপর না দেখে নিজের মতো লিখুন। শেষে মিলিয়ে দেখুন অর্থ ঠিক আছে কি না। প্যারাফ্রেজেও রেফারেন্স দিতে হয়, কারণ ধারণাটি অন্যের।
সারাংশ
দীর্ঘ রায় বা অধ্যায়ের মূল কথা কয়েক লাইনে বলাকে সারাংশ বলে। এখানেও উৎস উল্লেখ বাধ্যতামূলক।
একটি উদাহরণ
ধরুন, কোনো বইয়ে লেখা আছে: "Judicial review-এর মাধ্যমে আদালত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যথার্থতা নয়, বরং বৈধতা পরীক্ষা করে।"
- প্যাচরাইটিং (গ্রহণযোগ্য নয়): "Judicial review-এর দ্বারা আদালত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঠিকতা নয়, বৈধতা যাচাই করে।"
- ভালো প্যারাফ্রেজ: "আদালত এখানে নিজেকে প্রশাসনের জায়গায় বসিয়ে সিদ্ধান্তটি ভালো না মন্দ তা বিচার করে না; দেখে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া আইনসম্মত ছিল কি না।" সঙ্গে ফুটনোটে বইটির রেফারেন্স।
অনিচ্ছাকৃত plagiarism ঠেকানোর অভ্যাস
- পড়ার সময়েই উৎস লিখে রাখুন। নোটের প্রতিটি অংশের পাশে বইয়ের নাম, পৃষ্ঠা বা মামলার সাইটেশন লিখুন। লেখার শেষ মুহূর্তে উৎস খুঁজতে গেলেই গোলমাল হয়।
- নোটে দুই রঙ ব্যবহার করুন। হুবহু তুলে রাখা অংশ এক রঙে, নিজের ভাবনা আরেক রঙে। পরে লেখার সময় বোঝা যায় কোনটি উদ্ধৃতি।
- প্রথমে কাঠামো, তারপর উৎস। নিজের যুক্তির কাঠামো আগে দাঁড় করান, তারপর প্রতিটি যুক্তির সমর্থনে উৎস বসান। উল্টোটা করলে লেখা উৎসের সারাংশে পরিণত হয়।
- একটি রেফারেন্সিং পদ্ধতি বেছে নিন। শিক্ষক নির্দিষ্ট পদ্ধতি না বললে OSCOLA-র মতো স্বীকৃত একটি স্টাইল অনুসরণ করুন এবং পুরো লেখায় সেটিই বজায় রাখুন।
- AI টুল সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। AI দিয়ে লেখা তৈরি করে নিজের নামে জমা দেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানে অসদাচরণ। তা ছাড়া AI ভুল বা অস্তিত্বহীন মামলার রেফারেন্সও দিতে পারে।
Plagiarism ধরা পড়লে কী হতে পারে
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে নিয়ম আলাদা। অনেক প্রতিষ্ঠান similarity-check সফটওয়্যারে অ্যাসাইনমেন্ট ও থিসিস যাচাই করে। ফলাফল হতে পারে সংশ্লিষ্ট কাজে শূন্য নম্বর, কোর্সে অকৃতকার্য, পুনরায় জমা দেওয়ার নির্দেশ, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা। নিজের প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নীতিমালা বা কোর্স আউটলাইনে এ বিষয়ে কী বলা আছে, তা শুরুতেই জেনে নিন।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার: similarity রিপোর্টে কিছু শতাংশ মিল থাকা মানেই plagiarism নয়। আইনের ধারা বা রায়ের উদ্ধৃতি সঠিকভাবে উদ্ধৃতিচিহ্নে রাখলে তা মিল হিসেবে ধরা পড়লেও অসদাচরণ নয়। তাই সংখ্যার চেয়ে উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স ঠিকঠাক আছে কি না, সেটাই আসল।
পেশাগত জীবনেও এই অভ্যাস কাজে লাগে
আদালতে দাখিল করা লিখিত যুক্তি, লিগ্যাল ওপিনিয়ন বা গবেষণা প্রতিবেদনে উৎস স্পষ্ট না থাকলে লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। শিক্ষাজীবনে সঠিকভাবে উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স দেওয়ার অভ্যাস তাই পেশাগত দক্ষতারও ভিত্তি। আইনি লেখার সাধারণ নিয়ম নিয়ে আরও জানতে পড়ুন Legal writing আর সাধারণ লেখার মধ্যে পার্থক্য কী।
শেষ কথা
আইনের লেখায় মৌলিকতা মানে উৎস ছাড়া লেখা নয়। মানে হলো উৎসগুলো সৎভাবে দেখানো এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে নিজের বিশ্লেষণ যোগ করা। পড়ার সময় উৎস টুকে রাখা, নিজের ভাষায় লেখা আর ধারাবাহিকভাবে রেফারেন্স দেওয়া—এই তিনটি অভ্যাস থাকলে plagiarism নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ থাকে না।

মন্তব্যসমূহ (০)