প্রথমবার কোনো আইনের বই বা রায়ের ভেতরে "41 DLR (AD) 165" লেখা দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো সংকেত। আসলে এটি একটি ঠিকানা—কোন বইয়ের কোন খণ্ডের কোন পৃষ্ঠায় রায়টি ছাপা হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা। সাইটেশন পড়তে জানলে লাইব্রেরিতে বা অনলাইন ডেটাবেজে রায় খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। নিজের লেখায় সঠিকভাবে সাইটেশন দিতে পারলে পরীক্ষক বা পাঠক বুঝতে পারেন আপনি উৎস যাচাই করেছেন।
ল রিপোর্ট আসলে কী
উচ্চ আদালতের সব রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেসব রায়ে নতুন আইনি নীতি তৈরি হয়, পুরোনো নীতির ব্যাখ্যা বদলায় বা কোনো বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়, সেগুলো বাছাই করে নিয়মিত খণ্ড আকারে প্রকাশ করা হয়। এই প্রকাশনাগুলোই ল রিপোর্ট। প্রতিটি রিপোর্টের একটি নিজস্ব সংক্ষিপ্ত নাম থাকে, আর সাইটেশনে সেই সংক্ষিপ্ত নামই ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি ল রিপোর্ট
- DLR (Dhaka Law Reports): সবচেয়ে পুরোনো ও বহুল উদ্ধৃত রিপোর্টগুলোর একটি। পাকিস্তান আমল থেকে প্রকাশিত হওয়ায় পুরোনো নজির খুঁজতে এটি বিশেষ কাজের।
- BLD (Bangladesh Legal Decisions): আদালতে ও পাঠ্যবইয়ে নিয়মিত উদ্ধৃত হয়।
- BLC (Bangladesh Law Chronicles): সাম্প্রতিক দশকগুলোর রায়ের জন্য প্রচলিত।
- MLR, BLT, ADC ইত্যাদি: আরও কয়েকটি বেসরকারি রিপোর্ট, যেগুলোও আদালতে উদ্ধৃত হয়।
- SCOB (Supreme Court Online Bulletin): সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব অনলাইন প্রকাশনা, যেখানে বাছাই করা রায় বিনামূল্যে পড়া যায়।
এখানে উল্লেখ করা তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়। কোন রিপোর্ট কতটা প্রামাণ্য বা কোনটি কে প্রকাশ করে, সেসব খুঁটিনাটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম দিকে জরুরি নয়; জরুরি হলো সংক্ষিপ্ত নাম দেখে রিপোর্টটি চিনতে পারা।
একটি সাইটেশনকে টুকরো করে পড়া
অষ্টম সংশোধনী মামলা নামে পরিচিত Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh মামলার একটি প্রচলিত সাইটেশন হলো 41 DLR (AD) 165। এটি এভাবে পড়তে হয়:
| অংশ | অর্থ |
|---|---|
| 41 | DLR-এর খণ্ড (volume) নম্বর |
| DLR | ল রিপোর্টের নাম—Dhaka Law Reports |
| (AD) | রায়টি আপিল বিভাগের (Appellate Division) |
| 165 | যে পৃষ্ঠা থেকে রায়টি শুরু হয়েছে |
একই মামলার আরেকটি পরিচিত সাইটেশন হলো 1989 BLD (Spl) 1। এখানে প্রথমে বছর, তারপর রিপোর্টের নাম, বিশেষ সংখ্যা বোঝাতে (Spl), শেষে পৃষ্ঠা। অর্থাৎ সব রিপোর্টের কাঠামো হুবহু এক নয়—কোথাও খণ্ড নম্বর আগে, কোথাও বছর। মূল উপাদানগুলো চিনে ফেললে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোও সহজে পড়া যায়।
বিভাগ চেনার সংকেত
সাইটেশনে (AD) থাকলে রায়টি আপিল বিভাগের। হাইকোর্ট বিভাগের রায় বোঝাতে কোনো কোনো রিপোর্ট (HCD) বা (HC) লেখে, আবার কোনো রিপোর্টে আলাদা চিহ্ন থাকে না। নজির হিসেবে কোন রায় কতটা বাধ্যতামূলক, তা নির্ভর করে কোন বিভাগ রায়টি দিয়েছে তার ওপর। তাই এই ছোট্ট সংকেতটি খেয়াল করা জরুরি।
একই রায়ের একাধিক সাইটেশন কেন থাকে
গুরুত্বপূর্ণ রায় সাধারণত একাধিক ল রিপোর্টে ছাপা হয়। ফলে একটি বইয়ে কোনো মামলার সাইটেশন DLR-এ, আর অন্য বইয়ে BLD-তে দেখা যেতে পারে। দুটিই সঠিক হতে পারে। নিজের লেখায় হাতের কাছে থাকা ও যাচাই করা যেকোনো একটি সাইটেশন দিলেই চলে। চাইলে "; " দিয়ে আলাদা করে দুটিও দেওয়া যায়।
নিজের লেখায় সাইটেশন দেওয়ার নিয়ম
- মামলার নাম লিখুন। পক্ষদের নাম "v" দিয়ে আলাদা করুন, যেমন Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh। টাইপ করা লেখায় নাম ইটালিক করা প্রচলিত রীতি।
- এরপর সাইটেশন। খণ্ড/বছর, রিপোর্ট, বিভাগ ও পৃষ্ঠা—যেভাবে রিপোর্টে আছে সেভাবেই লিখুন।
- নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ উল্লেখ করলে সেটিও দিন, যেমন "para 25"। এতে পাঠক সরাসরি সেই অংশে যেতে পারেন।
- পুরো লেখায় একই ধরন বজায় রাখুন। একবার ফুটনোটে, আরেকবার মূল লেখায় বন্ধনীর ভেতরে—এমন মিশ্রণ এড়ান।
অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণাপত্রে বিদেশি মামলা ও বইসহ সব উৎসের সাইটেশন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে দিতে চাইলে OSCOLA-র মতো রেফারেন্সিং স্টাইল অনুসরণ করা যায়।
পরীক্ষার খাতায় কতটুকু লিখবেন
হাতে লেখা পরীক্ষায় পুরো সাইটেশন মনে রাখা সবসময় সম্ভব নয়, আর তা বাধ্যতামূলকও নয়। মামলার নাম ঠিকঠাক লিখে সাথে মূল নীতিটি সঠিকভাবে বললেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তবে নিশ্চিতভাবে মনে থাকলে সংক্ষিপ্ত সাইটেশন যোগ করা উত্তরকে সমৃদ্ধ করে। অনুমান করে খণ্ড বা পৃষ্ঠা নম্বর বসানো বরং ক্ষতিকর, কারণ ভুল তথ্য পরীক্ষকের চোখে পড়ে। ভুল উদ্ধৃতির ঝুঁকি নিয়ে আরও জানতে পড়ুন আইন পরীক্ষার উত্তরে ভুল ধারা উদ্ধৃত করলে কী সমস্যা হয়।
সাইটেশন থেকে রায় খুঁজে বের করবেন যেভাবে
- বিশ্ববিদ্যালয় বা বার লাইব্রেরি: রিপোর্টের নাম ও খণ্ড দেখে তাক থেকে বই নামিয়ে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় যান।
- অনলাইন ডেটাবেজ: অনেক সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ডেটাবেজে সাইটেশন লিখে সরাসরি খোঁজা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবস্ক্রিপশন থাকলে সেটি কাজে লাগান।
- সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট: সাম্প্রতিক অনেক রায় supremecourt.gov.bd-এ পাওয়া যায়।
অনলাইনে আইন ও রায় খোঁজার অন্যান্য উৎস নিয়ে বিস্তারিত আছে বাংলাদেশের আইন ও রায় অনলাইনে খোঁজার উৎস লেখায়।
সাধারণ ভুলগুলো
- অন্যের বই থেকে সাইটেশন কপি করে নিজে যাচাই না করা। মূল বইয়ে ছাপার ভুল থাকলে সেটিই আপনার লেখায় চলে আসে।
- (AD) বাদ দিয়ে লেখা। এতে পাঠক ভাবতে পারেন রায়টি হাইকোর্ট বিভাগের, যা নজিরের মূল্য বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
- মামলার নামের বানান নিজের মতো বদলে ফেলা। রিপোর্টে যেভাবে আছে সেভাবেই লিখুন।
- একই লেখায় একই মামলার দুই রকম সাইটেশন দেওয়া, যাতে মনে হয় দুটি আলাদা মামলা।
শেষ কথা
সাইটেশন পড়া একবার শিখে ফেললে আর ভুলে যাওয়ার কিছু নেই: খণ্ড বা বছর, রিপোর্টের নাম, বিভাগ, পৃষ্ঠা। প্রথম কয়েকবার রেফারেন্স থেকে মূল রায় খুঁজে বের করার অভ্যাস করুন। এতে সাইটেশন পড়া স্বাভাবিক হয়ে যাবে, আর নিজের লেখার রেফারেন্সও নির্ভুল হবে।

মন্তব্যসমূহ (০)