j
LLB

Historical School ও Sociological School of Jurisprudence-এর মূল বক্তব্য আলোচনা কর

বইয়ের তাক, ঘড়ি ও মানুষের নেটওয়ার্কের পাশে আইনদর্শনের দুই চিন্তাধারা নিয়ে ভাবছে একজন শিক্ষার্থী—কার্টুন চিত্র
প্রতীকী ছবি: LLB

মূল পয়েন্ট

  • Historical school-এর মতে আইন জাতির ইতিহাস ও সাধারণ চেতনা (Volksgeist) থেকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়
  • হেনরি মেইন দেখিয়েছেন প্রগতিশীল সমাজে আইন 'status থেকে contract'-এর দিকে অগ্রসর হয়
  • Sociological school আইনকে সমাজের বিভিন্ন স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখে
  • এরলিখের 'জীবন্ত আইন' ধারণা মনে করিয়ে দেয় যে বইয়ের আইন আর বাস্তবে চলমান আইন এক নয়

আইন কোথা থেকে আসে? সার্বভৌমের আদেশ থেকে, যেমন অস্টিন বলেছিলেন? প্রকৃতির শাশ্বত নীতি থেকে, যেমন প্রাকৃতিক আইনের তাত্ত্বিকেরা বলেন? নাকি সমাজের ইতিহাস, প্রথা আর মানুষের প্রতিদিনের জীবন থেকে? আইনদর্শনের দুটি প্রভাবশালী চিন্তাধারা—Historical School ও Sociological School—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে সমাজের দিকে তাকিয়ে। তবে দুটির দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন: একটি তাকায় অতীতের দিকে, অন্যটি বর্তমান সমাজের কার্যকারিতার দিকে।

Historical School of Jurisprudence

পটভূমি

অষ্টাদশ শতকের শেষ ও উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপে যুক্তিবাদী চিন্তা ও প্রাকৃতিক আইনের প্রভাব ছিল প্রবল। অনেকে বিশ্বাস করতেন, যুক্তির ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনগ্রন্থ রচনা করে যেকোনো সমাজে প্রয়োগ করা যায়। ফরাসি দেওয়ানি কোডের প্রভাবে জার্মানিতেও একটি অভিন্ন কোড প্রণয়নের প্রস্তাব ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় historical school-এর জন্ম।

ফ্রিডরিখ কার্ল ফন সাভিনি

এই চিন্তাধারার প্রধান প্রবক্তা জার্মান আইনবিদ সাভিনি (১৭৭৯–১৮৬১)। তাঁর মূল বক্তব্য:

  • Volksgeist: আইন একটি জাতির সাধারণ চেতনা বা "জাতীয় আত্মা"র প্রকাশ। ভাষার মতোই আইনও জাতির জীবনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে জন্মায় ও বিকশিত হয়।
  • আইন তৈরি হয় না, বেড়ে ওঠে: আইনপ্রণেতা ইচ্ছামতো আইন বানাতে পারেন না; তিনি বড়জোর জনগণের মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান আইনি চেতনাকে রূপ দেন।
  • প্রথার প্রাধান্য: প্রথা আইনের প্রধান উৎস; আইন প্রণয়নের স্থান গৌণ।
  • তাড়াহুড়া করে কোড প্রণয়নের বিরোধিতা: জার্মানিতে অভিন্ন কোড প্রণয়নের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সাভিনি যুক্তি দেন যে জাতির আইনি চেতনা পরিণত হওয়ার আগে কোড প্রণয়ন ক্ষতিকর।

সাভিনির শিষ্য পুখটা এই ধারণা আরও এগিয়ে নেন এবং আইনের বিকাশে আইনবিদদের ভূমিকার ওপর জোর দেন।

স্যার হেনরি মেইন

ইংরেজ আইনবিদ হেনরি মেইন তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন সমাজের আইন বিশ্লেষণ করেন। তাঁর Ancient Law (1861) গ্রন্থের বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ: প্রগতিশীল সমাজের বিকাশ এ পর্যন্ত "status থেকে contract"-এর দিকে। অর্থাৎ প্রাচীন সমাজে মানুষের অধিকার ও দায় নির্ধারিত হতো জন্মগত মর্যাদা, পরিবার বা গোষ্ঠীর অবস্থান দিয়ে। আধুনিক সমাজে তা ক্রমশ নির্ধারিত হয় ব্যক্তির স্বাধীন চুক্তি দিয়ে।

মেইন আইনের বিকাশের ধাপও বর্ণনা করেন—শাসকের ঐশী নির্দেশ থেকে প্রথা, তারপর লিখিত আইন—এবং দেখান প্রগতিশীল সমাজ legal fiction, equity ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আইনকে সমাজের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়ায়।

সমালোচনা

  • "Volksgeist" ধারণাটি অস্পষ্ট ও প্রমাণ করা কঠিন। একটি জাতির মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আইনি চেতনা ভিন্ন হয়।
  • আইনসভার সচেতন সংস্কারের ভূমিকাকে খাটো করে দেখে। সমাজের ক্ষতিকর প্রথা বদলাতে আইন প্রণয়নই প্রায়ই প্রধান হাতিয়ার।
  • অতীতমুখী হওয়ায় রক্ষণশীলতার ঝুঁকি আছে।
  • অনেক আইন অন্য সমাজ থেকে গৃহীত, যেমন উপনিবেশিক আমলে উপমহাদেশে প্রবর্তিত বিধিবদ্ধ আইন। এগুলো জাতীয় চেতনা থেকে জন্মায়নি, তবু টিকে আছে।

Sociological School of Jurisprudence

পটভূমি

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর সামাজিক সংঘাত বাড়তে থাকে। প্রশ্ন ওঠে, আইন কী—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আইন সমাজে কী করে এবং কী করা উচিত। এই প্রেক্ষাপটে sociological school আইনকে সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ শুরু করে।

রুডলফ ফন ইয়েরিং

জার্মান আইনবিদ ইয়েরিং আইনকে একটি উদ্দেশ্যসাধনের উপায় হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে আইনের কেন্দ্রে আছে স্বার্থ, আর আইন সমাজে বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে তাঁকে sociological চিন্তার অন্যতম পথিকৃৎ ধরা হয়।

রসকো পাউন্ড

মার্কিন আইনবিদ রসকো পাউন্ড এই চিন্তাধারার সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তাঁর মূল ধারণা:

  • সামাজিক প্রকৌশল (social engineering): আইন হলো সমাজের বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী চাহিদা ও স্বার্থের মধ্যে এমন ভারসাম্য তৈরির হাতিয়ার, যাতে সর্বনিম্ন ঘর্ষণে সর্বাধিক চাহিদা পূরণ হয়।
  • স্বার্থের শ্রেণিবিভাগ: ব্যক্তিগত স্বার্থ, জনস্বার্থ (রাষ্ট্রের স্বার্থ) ও সামাজিক স্বার্থ। আইনের কাজ এগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
  • "Law in books" বনাম "law in action": বইয়ে লেখা আইন আর বাস্তবে প্রয়োগ হওয়া আইনের পার্থক্য খুঁজে বের করা আইনবিদের দায়িত্ব।

ইউজেন এরলিখ

অস্ট্রীয় আইনবিদ এরলিখের মতে আইনের বিকাশের কেন্দ্র আইনসভা বা আদালত নয়, সমাজ নিজেই। তাঁর "জীবন্ত আইন" (living law) ধারণা অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে সমাজের ভেতরের নিয়ম—পরিবার, ব্যবসা, সম্প্রদায়ের রীতি। এগুলো সবসময় আনুষ্ঠানিক আইনের সঙ্গে মেলে না।

লেওঁ দুগি

ফরাসি আইনবিদ দুগি সামাজিক সংহতিকে (social solidarity) আইনের ভিত্তি হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে রাষ্ট্রের ক্ষমতাও এই সংহতি রক্ষার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ।

সমালোচনা

  • "স্বার্থ" বা "সামাজিক চাহিদা" নির্ধারণ কে করবে এবং কীভাবে—এর কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নেই।
  • আইনকে শুধু সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে দেখলে ব্যক্তির অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থের কাছে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
  • আইন আর সমাজবিজ্ঞানের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

দুই চিন্তাধারার তুলনা

ভিত্তিHistorical SchoolSociological School
আইনের উৎসজাতির ইতিহাস ও সাধারণ চেতনাসমাজের বর্তমান চাহিদা ও স্বার্থ
দৃষ্টিঅতীতমুখীবর্তমান ও ভবিষ্যৎমুখী
আইন প্রণয়নের ভূমিকাগৌণ, সতর্কতার সঙ্গেসামাজিক পরিবর্তনের সক্রিয় হাতিয়ার
প্রধান প্রবক্তাসাভিনি, পুখটা, মেইনইয়েরিং, পাউন্ড, এরলিখ, দুগি
প্রধান সমালোচনাঅস্পষ্টতা ও রক্ষণশীলতামানদণ্ডের অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে ধর্ম ও প্রথার প্রভাব historical school-এর পর্যবেক্ষণকে মনে করিয়ে দেয়। আবার নারী ও শিশু সুরক্ষা, শ্রম অধিকার বা ভোক্তা সুরক্ষার মতো বিষয়ে সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রণীত আইন sociological দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ। আইনের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগের ঘাটতি—পাউন্ডের ভাষায় "law in books" ও "law in action"-এর ফারাক—আজও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।

আইনদর্শনের অন্য তত্ত্বগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে দেখুন জন অস্টিনের Command Theory of Law, Positive Law ও Natural Law তত্ত্বের পার্থক্য এবং জুরিসপ্রুডেন্সে আইনের বিভিন্ন সংজ্ঞা।

পরীক্ষায় উত্তর লেখার কাঠামো

  1. ভূমিকা: দুই চিন্তাধারার পটভূমি।
  2. Historical school: সাভিনি, মেইন, সমালোচনা।
  3. Sociological school: ইয়েরিং, পাউন্ড, এরলিখ, সমালোচনা।
  4. তুলনামূলক সারণি।
  5. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।
  6. উপসংহার।

উপসংহার

Historical school মনে করিয়ে দেয়, আইন শূন্য থেকে তৈরি হয় না; সমাজের ইতিহাসে এর শিকড়। Sociological school মনে করিয়ে দেয়, আইনের মূল্য বিচার হয় সমাজে এর কার্যকারিতা দিয়ে। দুই দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরের পরিপূরক, আর একসঙ্গে পড়লে আইনকে একটি জীবন্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোঝা সহজ হয়।

শেয়ার করুন:
Legal Desk

Legal Desk

BDLawsDaily Legal Desk বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিধি ও গুরুত্বপূর্ণ রায় বিশ্লেষণ করে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ও নাগরিকের প্রয়োজনীয় আইনগত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করে।

মন্তব্যসমূহ (০)