সংসার ভেঙে গেলে বা স্বামী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ বা খোরপোষ পাওয়ার সুস্পষ্ট আইনগত অধিকার রয়েছে। অনেকেই জানেন না যে এটি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং আইন দ্বারা স্বীকৃত অধিকার, এবং না দিলে আদালতের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব।
খোরপোষ কী এবং কার অধিকার আছে
খোরপোষ বলতে বোঝায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর এবং বাবা কর্তৃক সন্তানের দৈনন্দিন প্রয়োজন—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা—মেটানোর দায়িত্ব। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বর্তায় এবং তালাক হলে ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত তা বলবৎ থাকে। সন্তানের ক্ষেত্রে বাবার ওপর এই দায়িত্ব সন্তানের প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত (এবং কন্যাসন্তানের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত) বহাল থাকে।
কোন আইনে প্রতিকার পাওয়া যায়
খোরপোষ দাবির জন্য মূলত দুটি আইনগত পথ রয়েছে।
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫
পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা দায়ের করাই সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর পথ। এই আদালত বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, হেফাজত ও ভরণপোষণ—একসঙ্গে একাধিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে বলে স্ত্রীরা সাধারণত এই পথই বেছে নেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা
দ্রুত ও সাময়িক প্রতিকারের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও আবেদন করা যায়। স্বামী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করলে ম্যাজিস্ট্রেট মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করে দিতে পারেন। তবে চূড়ান্ত ও বিস্তারিত নিষ্পত্তির জন্য পারিবারিক আদালতই সাধারণত বেশি উপযোগী।
আদালত কীভাবে পরিমাণ নির্ধারণ করে
নির্দিষ্ট কোনো সূত্র আইনে বেঁধে দেওয়া নেই। আদালত সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়—
- স্বামীর প্রকৃত আয় ও সামর্থ্য
- স্ত্রী ও সন্তানের প্রয়োজনীয় জীবনযাপনের মান
- সন্তানের বয়স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ব্যয়
- এলাকার জীবনযাত্রার ব্যয়
স্বামীর প্রকৃত আয় গোপন থাকলে আদালত ব্যাংক হিসাব, চাকরির নথি বা ব্যবসার তথ্য চেয়ে পাঠাতে পারে।
মামলা দায়েরের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া
- স্বামী বা সন্তানের বাবার এখতিয়ারভুক্ত এলাকার পারিবারিক আদালতে আরজি দাখিল করতে হয়।
- আরজিতে স্বামীর আয়, সংসারের ব্যয় ও দাবির পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়।
- আদালত নোটিশ পাঠানোর পর উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ শুনে রায় দেয়।
- রায়ে নির্ধারিত অঙ্ক না দিলে ডিক্রি জারি করে সম্পত্তি ক্রোক বা অন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়
তালাকের পর ইদ্দতকালীন খোরপোষ পাওয়া প্রায় নিশ্চিত অধিকার হলেও, ইদ্দত-পরবর্তী সময়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি খোরপোষ দাবি করতে হলে তা পৃথকভাবে প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে আদালতে উপস্থাপন করতে হয়। স্বামী যদি প্রবাসে থাকেন, তাহলেও দেশের পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায় এবং প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডিক্রি কার্যকরের আইনগত পন্থা অনুসরণ করা যায়।
খোরপোষ না পাওয়া কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—এটি একটি আইনগত অধিকারের লঙ্ঘন, এবং পারিবারিক আদালত এই অধিকার আদায়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

মন্তব্যসমূহ (০)