কেউ অন্যের মানিব্যাগ নিজের মনে করে ভুল করে তুলে নিলেন, আরেকজন জেনেশুনে চুরির উদ্দেশ্যে একই কাজ করলেন। বাহ্যিকভাবে কাজ একই, কিন্তু আইনের চোখে দুজনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পার্থক্য বোঝার চাবিকাঠি ফৌজদারি আইনের দুটি মৌলিক ধারণা: actus reus এবং mens rea। LLB-র ফৌজদারি আইন কোর্সের প্রায় প্রতিটি অধ্যায় এই দুই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মূল নীতি: দোষী মন ছাড়া কাজ অপরাধ নয়
লাতিন সূত্র actus non facit reum nisi mens sit rea—অর্থাৎ দোষী মন ছাড়া কাজ নিজে কাউকে অপরাধী করে না। এই সূত্র থেকে দুটি উপাদান এসেছে:
- Actus reus: অপরাধের বাহ্যিক বা শারীরিক উপাদান।
- Mens rea: অপরাধের মানসিক উপাদান, অর্থাৎ দোষী মানসিক অবস্থা।
সাধারণ নিয়মে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে রাষ্ট্রপক্ষকে দুটি উপাদানই প্রমাণ করতে হয়।
Actus reus: অপরাধমূলক কাজ
Actus reus শুধু একটি শারীরিক কাজ নয়। এর মধ্যে থাকতে পারে:
১. কাজ বা কাজ না করা (act or omission)
সাধারণত ইতিবাচক কাজ, যেমন আঘাত করা বা জিনিস সরিয়ে নেওয়া। তবে আইনগত কর্তব্য থাকা অবস্থায় কাজ না করাও actus reus হতে পারে। দণ্ডবিধির ৩২ ধারা অনুযায়ী কাজ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে বেআইনি বিরতিও (illegal omission) অন্তর্ভুক্ত। যেমন অভিভাবক ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে খাবার না দিলে, তা কাজ না করার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের উদাহরণ।
২. পরিস্থিতি (circumstances)
কিছু অপরাধে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থাকা জরুরি। চুরির ক্ষেত্রে সম্পত্তিটি অন্যের দখলে থাকা এবং মালিকের সম্মতি না থাকা—এগুলো actus reus-এর অংশ।
৩. ফলাফল (consequence)
খুনের মতো অপরাধে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল, অর্থাৎ মৃত্যু, ঘটতে হয়, এবং অভিযুক্তের কাজ ও সেই ফলাফলের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক থাকতে হয়।
৪. স্বেচ্ছামূলকতা
কাজটি অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণাধীন হতে হয়। কেউ ধাক্কা খেয়ে অন্যের ওপর পড়ে গেলে সেটি তাঁর স্বেচ্ছামূলক কাজ নয়।
Mens rea: দোষী মানসিক অবস্থা
Mens rea বলতে বোঝায় অপরাধ সংঘটনের সময় অভিযুক্তের মনের অবস্থা। এর বিভিন্ন মাত্রা আছে:
- অভিপ্রায় (intention): নির্দিষ্ট ফল ঘটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা।
- জ্ঞান (knowledge): জানা যে কাজটি থেকে নির্দিষ্ট ফল ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
- বেপরোয়া মনোভাব (recklessness): ঝুঁকি জেনেও তা উপেক্ষা করা।
- অবহেলা (negligence): যুক্তিসংগত সতর্কতা অবলম্বন না করা। কিছু অপরাধে অবহেলাই যথেষ্ট মানসিক উপাদান।
দণ্ডবিধিতে mens rea-র প্রতিফলন
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ "mens rea" শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু প্রায় প্রতিটি অপরাধের সংজ্ঞায় মানসিক উপাদান নির্দিষ্ট শব্দে ঢুকিয়ে দেওয়া আছে। দণ্ডবিধির শুরুর দিকের সংজ্ঞা অংশে এসব শব্দের অর্থ দেওয়া আছে:
| শব্দ | দণ্ডবিধির ধারা | মূল অর্থ |
|---|---|---|
| অসাধুভাবে (dishonestly) | ২৪ | অন্যায় লাভ বা অন্যায় ক্ষতি ঘটানোর অভিপ্রায় |
| প্রতারণামূলকভাবে (fraudulently) | ২৫ | প্রতারণা করার অভিপ্রায় |
| বিশ্বাস করার কারণ (reason to believe) | ২৬ | বিশ্বাস করার পর্যাপ্ত কারণ থাকা |
| স্বেচ্ছায় (voluntarily) | ৩৯ | অভিপ্রায় বা জ্ঞান বা সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্বাস করার কারণসহ ফল ঘটানো |
এর ফলে দণ্ডবিধিতে প্রতিটি অপরাধের mens rea আলাদা। যেমন চুরিতে "অসাধুভাবে", প্রতারণায় প্রতারণার অভিপ্রায়। খুনের সংজ্ঞায় (ধারা ৩০০) মৃত্যু ঘটানোর অভিপ্রায় বা এমন শারীরিক আঘাতের অভিপ্রায়ের কথা আছে, যা মৃত্যু ঘটানোর সম্ভাবনা রাখে। এই মানসিক উপাদানের মাত্রার পার্থক্যই খুন ও শাস্তিযোগ্য নরহত্যার পার্থক্যের মূল। বিস্তারিত দেখুন Culpable Homicide ও Murder-এর পার্থক্য লেখায়।
সমকালীনতার নীতি
অপরাধ গঠনের জন্য actus reus ও mens rea একই সময়ে বিদ্যমান থাকতে হয়। কাজের সময় দোষী মন না থাকলে, পরে সেই মন তৈরি হলেও সাধারণত অপরাধ হয় না। তবে আদালত কখনো কখনো চলমান কাজের (continuing act) ধারণা ব্যবহার করেন। ইংরেজি মামলা Fagan v Metropolitan Police Commissioner (1969)-এ চালক দুর্ঘটনাক্রমে পুলিশ কর্মকর্তার পায়ের ওপর গাড়ি তুলে দেন, তারপর জেনেও গাড়ি সরাতে অস্বীকার করেন। আদালত কাজটিকে চলমান ধরে বলেন, পরে তৈরি হওয়া অভিপ্রায় সেই চলমান কাজের সঙ্গে মিলে অপরাধ গঠন করেছে।
Mens rea না থাকলে: সাধারণ ব্যতিক্রম
দণ্ডবিধির সাধারণ ব্যতিক্রম (general exceptions) অধ্যায়ের অনেক বিধান আসলে mens rea-র অনুপস্থিতির স্বীকৃতি:
- ঘটনা সম্পর্কে ভুল (mistake of fact): সরল বিশ্বাসে ঘটনা সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে করা কাজ (ধারা ৭৬, ৭৯)। তবে আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা সাধারণত রক্ষাকবচ নয়।
- দুর্ঘটনা (accident): বৈধ কাজ যথাযথ সতর্কতার সঙ্গে করার সময় দুর্ঘটনাবশত ক্ষতি (ধারা ৮০)।
- শিশু: নয় বছরের কম বয়সী শিশুর কাজ অপরাধ নয় (ধারা ৮২), আর নয় থেকে বারো বছরের শিশুর ক্ষেত্রে বোঝার পরিপক্বতার প্রশ্ন বিবেচ্য (ধারা ৮৩)। বাংলাদেশে এই বয়সসীমা সংশোধনীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে, তাই পুরোনো বইয়ের সংখ্যা মিলিয়ে নিন।
- মানসিক অসুস্থতা (ধারা ৮৪): কাজের প্রকৃতি বা তা অন্যায় বা আইনবিরুদ্ধ, তা বোঝার অক্ষমতা।
সাধারণ ব্যতিক্রমের মধ্যে আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে আছে Right of Private Defence-এর শর্তাবলি শীর্ষক আলোচনা।
কঠোর দায় (strict liability): mens rea ছাড়াই অপরাধ
কিছু অপরাধে আইনপ্রণেতা mens rea প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বাদ দিতে পারেন। সাধারণত খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কারচুপি, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা, পরিবেশ বা সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণমূলক অপরাধে এমন দেখা যায়। যুক্তি হলো, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় সতর্কতার উচ্চ মান নিশ্চিত করা।
তবে আদালত সাধারণত ধরে নেন যে আইনপ্রণেতা mens rea বাদ দিতে চাননি, যদি না আইনের ভাষা বা উদ্দেশ্য থেকে তা স্পষ্ট হয়। ইংরেজি মামলা Sweet v Parsley (1970)-এ হাউস অব লর্ডস এই অনুমানের ওপর জোর দেন। গুরুতর শাস্তিযুক্ত অপরাধে কঠোর দায় আরোপ সহজে মেনে নেওয়া হয় না।
Motive ও mens rea এক নয়
উদ্দেশ্য (motive) হলো কাজের পেছনের কারণ, যেমন প্রতিশোধ বা অভাব। Mens rea হলো কাজের সময় ফল সম্পর্কে অভিপ্রায় বা জ্ঞান। ভালো উদ্দেশ্যে করা চুরিও চুরি, কারণ "অসাধুভাবে" সম্পত্তি সরানোর অভিপ্রায় ছিল। তবে প্রমাণের ক্ষেত্রে motive প্রাসঙ্গিক তথ্য হতে পারে, বিশেষ করে পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যনির্ভর মামলায়।
পরীক্ষায় উত্তর লেখার কাঠামো
- লাতিন সূত্র ও তার অর্থ দিয়ে শুরু করুন।
- Actus reus-এর উপাদানগুলো (কাজ/বিরতি, পরিস্থিতি, ফলাফল, স্বেচ্ছামূলকতা) উদাহরণসহ।
- Mens rea-র মাত্রাগুলো এবং দণ্ডবিধিতে তার প্রতিফলন (ধারা ২৪, ২৫, ২৬, ৩৯)।
- সমকালীনতার নীতি ও একটি নজির।
- সাধারণ ব্যতিক্রমের সঙ্গে সম্পর্ক।
- কঠোর দায় ও তার সীমা।
- সংক্ষিপ্ত উপসংহার।
ধারা নম্বর লেখার আগে মূল আইনের পাঠ bdlaws.minlaw.gov.bd-এ মিলিয়ে নেওয়া ভালো। অপরাধ ও টর্টের সাধারণ পার্থক্য নিয়ে পড়ুন Tort ও Crime-এর মধ্যে পার্থক্য।
উপসংহার
Actus reus বলে কী ঘটেছে, mens rea বলে কেন সেটিকে দোষী কাজ বলা যায়। ফৌজদারি দায় মূলত এই দুইয়ের সংযোগে তৈরি হয়। আধুনিক নিয়ন্ত্রণমূলক আইনে কঠোর দায়ের ব্যতিক্রম থাকলেও মৌলিক নীতি অপরিবর্তিত: নৈতিক দোষ ছাড়া কঠোর ফৌজদারি শাস্তি ন্যায়সংগত নয়।

মন্তব্যসমূহ (০)