প্রথমবার আদালতে যাওয়া একজন মানুষের জন্য প্রায়ই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গা হলো — এজলাসে বিচারক ছাড়াও আরও অনেকে কাজ করছেন, কিন্তু কে কোন কাজের জন্য দায়ী তা বোঝা কঠিন। মামলার তারিখ জানতে কার কাছে যেতে হবে, নথির নকল কোথা থেকে পাওয়া যাবে বা সমন কীভাবে পৌঁছায় — এসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে আদালতে যাতায়াত অনেক সহজ হয়ে যায়।
বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেট: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী
বিচারক (দেওয়ানি মামলায়) বা ম্যাজিস্ট্রেট (ফৌজদারি মামলায়) আদালতের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি, যিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ শুনে আইন অনুযায়ী আদেশ বা রায় দেন। মামলার আইনগত সিদ্ধান্ত একমাত্র তাঁরই এখতিয়ারে — অন্য কোনো কর্মকর্তা মামলার ফলাফল নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।
পেশকার (বেঞ্চ সহকারী): নথি ও কার্যতালিকার কেন্দ্রবিন্দু
পেশকার প্রতিটি এজলাসের সঙ্গে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, যিনি মামলার নথিপত্র সংরক্ষণ, দৈনিক কার্যতালিকা (কজলিস্ট) প্রস্তুত, আদেশ লিপিবদ্ধকরণ এবং আদালতের আদেশ বা রায়ের সার্টিফায়েড কপি (নকল) ইস্যু-সংক্রান্ত কাজ দেখাশোনা করেন। মামলার পরবর্তী তারিখ, কোনো নথি জমা পড়েছে কি না বা রায়ের কপি কীভাবে পাওয়া যাবে — এই ধরনের প্রশাসনিক তথ্যের জন্য সাধারণত পেশকারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়।
নাজির: আদালতের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধায়ক
নাজির আদালতের প্রশাসনিক শাখার দায়িত্বে থাকেন এবং সমন, নোটিশ, ওয়ারেন্ট জারির প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেন। জারিকারকদের কাজ বণ্টন, জামানত ও জরিমানার অর্থ গ্রহণ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্বও সাধারণত নাজিরের কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
জারিকারক (প্রসেস সার্ভার): নোটিশ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব
আদালত কোনো পক্ষ বা সাক্ষীর কাছে সমন বা নোটিশ পাঠানোর আদেশ দিলে তা বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন জারিকারক। তিনি সমন গ্রহীতার কাছে সরাসরি গিয়ে তা হস্তান্তর করেন এবং প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আদালতে ফেরত জমা দেন, যা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছে। কাউকে খুঁজে না পেলে বা তিনি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে জারিকারক তা প্রতিবেদন আকারে আদালতকে জানান, যার ভিত্তিতে আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ (যেমন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সমন জারি) নির্ধারণ করতে পারে।
স্টেনোগ্রাফার: জবানবন্দি ও রায়ের লিখিত রূপ
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় সাক্ষীর জবানবন্দি বা বিচারকের ডিকটেশন অনুযায়ী রায়ের খসড়া লিপিবদ্ধ করার কাজ করেন স্টেনোগ্রাফার। বিশেষ করে দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ বা জটিল মামলায় দ্রুত ও নির্ভুল লিখিত রেকর্ড তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যা পরবর্তীতে মামলার নথির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।
আইনজীবী ও তাঁর সহকারী (মুহুরি)
আইনজীবী মক্কেলের পক্ষে আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করেন, আর তাঁর সহকারী (মুহুরি বা ল-ক্লার্ক নামে পরিচিত) সাধারণত কাগজপত্র জমা দেওয়া, নকলের আবেদন করা বা মামলার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা করেন। উপযুক্ত আইনজীবী নির্বাচনের আগে কী কী বিষয় যাচাই করা উচিত তা জানতে পড়ুন উপযুক্ত আইনজীবী নির্বাচনের আগে যা যাচাই করা জরুরি।
একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে যা জানা দরকার
- মামলার পরবর্তী তারিখ বা কোনো আদেশের অগ্রগতি জানতে সাধারণত পেশকারের কার্যালয়ে খোঁজ নেওয়া হয়, বিচারকের সঙ্গে সরাসরি নয়।
- রায় বা আদেশের সার্টিফায়েড কপি প্রয়োজন হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে পেশকারের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।
- সমন বা নোটিশ ঠিকমতো না পেলে বা ঠিকানা পরিবর্তন হলে দ্রুত আদালতকে অবহিত করা উচিত, যাতে জারিকারক সঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেন।
- যেকোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন বা অভিযোগ সরাসরি সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেওয়াই নিরাপদ, মৌখিকভাবে নয়।
আদালতের এই বিভিন্ন কর্মকর্তার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে একজন বিচারপ্রার্থী তাঁর মামলার অগ্রগতি সহজে বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক জায়গায় যোগাযোগ করতে পারেন — যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনেক কম বিভ্রান্তিকর করে তোলে।

মন্তব্যসমূহ (০)