দেওয়ানি মামলার যাত্রা শুরু হয় একটি দলিল দিয়ে, যার নাম আরজি (Plaint)। এখানে বাদী আদালতকে জানান তিনি কে, কার বিরুদ্ধে মামলা করছেন, কোন ঘটনার কারণে তাঁর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং আদালতের কাছে তিনি কী প্রতিকার চান। মামলার পরবর্তী সব ধাপ, যেমন বিচার্য বিষয় নির্ধারণ, সাক্ষ্য ও রায়, এই আরজির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দুর্বল আরজি মানে দুর্বল মামলা; অনেক সময় শুধু আরজির ত্রুটির কারণেই মামলা খারিজ হয়ে যায়।
এলএলবির ড্রাফটিং কোর্স, বার কাউন্সিলের লিখিত পরীক্ষা এবং নবীন আইনজীবীর প্রথম দিনের কাজ, সব জায়গায় আরজি লেখার দক্ষতা জরুরি। এই লেখায় আইনগত কাঠামো, একটি নমুনা গঠন এবং বাস্তব পরামর্শ দেওয়া হলো।
আইনগত ভিত্তি
আরজি লেখার মূল বিধান দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর দুটি আদেশে:
- আদেশ ৬: প্লিডিংয়ের সাধারণ নিয়ম, যা আরজি ও লিখিত জবাব দুটির জন্যই প্রযোজ্য।
- আদেশ ৭: বিশেষভাবে আরজির বিষয়বস্তু, দাখিল ও খারিজের নিয়ম।
এর পাশাপাশি কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ ও মামলার মূল্যায়ন আইন, ১৮৮৭ মূল্যায়ন ও ফি নির্ধারণে এবং তামাদি আইন, ১৯০৮ সময়সীমার প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক। মামলা দায়েরের সাধারণ নিয়ম জানতে পড়ুন দেওয়ানি মামলা দায়েরের প্রাথমিক নিয়ম।
প্লিডিংয়ের সাধারণ নিয়ম (আদেশ ৬)
- উপাদানগত তথ্য, প্রমাণ নয়: আরজিতে সেই তথ্যগুলো লিখতে হয়, যেগুলো দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয়। সেগুলো কীভাবে প্রমাণ করা হবে, অর্থাৎ সাক্ষ্য, তা আরজিতে নয়।
- সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট: অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা, আবেগ বা যুক্তিতর্ক বাদ দিতে হয়।
- অনুচ্ছেদভিত্তিক ও নম্বরযুক্ত: প্রতিটি অনুচ্ছেদে একটি বিষয়, ধারাবাহিক নম্বরসহ।
- তারিখ, অঙ্ক ও সংখ্যা: সংখ্যায় এবং প্রয়োজনে কথায়ও লেখা।
- প্রতারণা বা অসদাচরণের অভিযোগ: এ ধরনের অভিযোগ থাকলে তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয়; সাধারণভাবে "প্রতারণা করেছে" লেখা যথেষ্ট নয়।
- স্বাক্ষর ও সত্যপাঠ: পক্ষ ও আইনজীবীর স্বাক্ষর এবং শেষে সত্যপাঠ (verification), যেখানে বাদী জানান কোন অনুচ্ছেদ তাঁর নিজের জ্ঞানে সত্য আর কোনটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বাসে সত্য।
আরজির আবশ্যিক বিষয়বস্তু (আদেশ ৭ নিয়ম ১)
- যে আদালতে মামলা দায়ের করা হচ্ছে, তার নাম;
- বাদীর নাম, পরিচয় ও ঠিকানা;
- বিবাদীর নাম, পরিচয় ও ঠিকানা, যতটা নিশ্চিত করা সম্ভব;
- বাদী বা বিবাদী নাবালক বা অপ্রকৃতিস্থ হলে সে বিষয়ে বিবৃতি;
- মামলার কারণ গঠনকারী তথ্য এবং কখন মামলার কারণ উদ্ভূত হয়েছে;
- আদালতের এখতিয়ার দেখানোর তথ্য;
- বাদী যে প্রতিকার চান;
- বাদী কোনো দাবি ছেড়ে দিলে বা বিবাদীর পাওনা সমন্বয় করলে তার পরিমাণ;
- এখতিয়ার ও কোর্ট ফির উদ্দেশ্যে মামলার বিষয়বস্তুর মূল্যায়ন।
টাকার দাবি ও স্থাবর সম্পত্তি
টাকা আদায়ের মামলায় দাবিকৃত অঙ্ক সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয় (নিয়ম ২)। আর মামলার বিষয় স্থাবর সম্পত্তি হলে তা শনাক্ত করার মতো যথেষ্ট বিবরণ, যেমন মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর, পরিমাণ এবং চৌহদ্দি দিতে হয় (নিয়ম ৩)। বাস্তবে এই বিবরণ আরজির শেষে "তফসিল" আকারে দেওয়া হয়।
মামলার কারণ (Cause of action): আরজির হৃদয়
মামলার কারণ হলো সেই সব তথ্যের সমষ্টি, যা প্রমাণিত হলে বাদী আদালতের কাছ থেকে প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী হন। আরজিতে স্পষ্টভাবে দেখাতে হয়:
- বাদীর অধিকার কী, যেমন জমির মালিকানা বা চুক্তিভিত্তিক পাওনা;
- বিবাদী কী করে সেই অধিকার লঙ্ঘন করেছেন, যেমন দখল নেওয়া বা টাকা না দেওয়া;
- কবে ও কোথায় এই লঙ্ঘন ঘটেছে।
মামলার কারণ উদ্ভবের তারিখ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই তামাদির সময় গণনা শুরু হয়। আর কোথায় উদ্ভূত হয়েছে, তা আঞ্চলিক এখতিয়ার নির্ধারণে কাজে লাগে। তামাদির ধারণা জানতে দেখুন সীমাবদ্ধতা আইন: মামলা দায়েরের সময়সীমা।
এখতিয়ার, মূল্যায়ন ও কোর্ট ফি
আরজিতে তিন ধরনের এখতিয়ার দেখাতে হয়: বিষয়বস্তুগত (এ ধরনের মামলা এই আদালত শুনতে পারে কি না), আঞ্চলিক (সম্পত্তি বা মামলার কারণ এই আদালতের এলাকায় কি না) এবং আর্থিক (মামলার মূল্য এই আদালতের আর্থিক সীমার মধ্যে কি না)। মূল্যায়ন অনুযায়ী কোর্ট ফি পরিশোধ করতে হয়; ঘোষণামূলক মামলার মতো কিছু মামলায় নির্দিষ্ট হারে ফি, আর টাকা বা দখলের মামলায় মূল্যের ভিত্তিতে ফি।
প্রার্থনা (Relief)
আরজির শেষ অংশে বাদী যে প্রতিকার চান, তা নির্দিষ্টভাবে লিখতে হয়। যেমন: মালিকানার ঘোষণা, দখল পুনরুদ্ধার, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা, সুদ, মামলার খরচ এবং "আদালতের বিবেচনায় অন্যান্য প্রতিকার"। আদালত সাধারণত আরজিতে চাওয়া হয়নি এমন প্রধান প্রতিকার দেন না, তাই প্রার্থনা অংশ সম্পূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি।
একটি নমুনা কাঠামো
নিচের কাঠামোটি শুধু শেখার উদ্দেশ্যে; বাস্তব মামলায় সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের চর্চা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।
- শিরোনাম: "বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, [জেলা]"; "দেওয়ানি মামলা নং ........./২০....."
- পক্ষ: বাদী: নাম, পিতা, ঠিকানা। বনাম বিবাদী: নাম, পিতা, ঠিকানা।
- মামলার ধরন: "মালিকানা ঘোষণা ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা"; মূল্যায়ন ও কোর্ট ফির উল্লেখ।
- আরজির বিবরণ: "বাদী পক্ষে বিনীত নিবেদন এই যে," তারপর নম্বরযুক্ত অনুচ্ছেদে: সম্পত্তির মালিকানার উৎস ও ধারাবাহিকতা; বাদীর দখল; বিবাদীর হস্তক্ষেপ বা দাবি এবং তারিখ; বাদীর ক্ষতি ও আশঙ্কা।
- মামলার কারণ: "মামলার কারণ গত [তারিখে] [স্থানে] উদ্ভূত হইয়াছে, যখন বিবাদী..."।
- এখতিয়ার ও মূল্যায়ন: সম্পত্তির অবস্থান ও মূল্যায়ন।
- প্রার্থনা: ক, খ, গ আকারে প্রতিকারগুলো।
- তফসিল: সম্পত্তির বিবরণ।
- সত্যপাঠ ও স্বাক্ষর।
আরজির সঙ্গে যা দাখিল করতে হয়
- নির্ভরযোগ্য দলিলের তালিকা ও কপি: বাদী যেসব দলিলের ওপর নির্ভর করছেন, সেগুলো আরজির সঙ্গে বা নির্দিষ্ট তালিকায় দাখিল করার বিধান আদেশ ৭-এ আছে। গুরুত্বপূর্ণ দলিল পরে দাখিল করতে গেলে আদালতের অনুমতি লাগে।
- ওকালতনামা: আইনজীবী নিয়োগের দলিল।
- কোর্ট ফি: মূল্যায়ন অনুযায়ী নির্ধারিত স্ট্যাম্প।
- সমন জারির খরচ ও প্রয়োজনীয় কপি: প্রত্যেক বিবাদীর জন্য আরজির কপি ও সমন জারির খরচ।
- অন্তর্বর্তী প্রতিকারের আবেদন: অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাইলে আলাদা আবেদন ও হলফনামা। দেখুন দেওয়ানি মামলায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার নিয়ম।
আরজির ভাষা ও শৈলী
বাংলাদেশের অধস্তন দেওয়ানি আদালতে আরজি সাধারণত বাংলায় লেখা হয়, এবং প্রচলিত আদালতি ভাষায় কিছু নির্দিষ্ট অভিব্যক্তি ব্যবহৃত হয়, যেমন "বিনীত নিবেদন এই যে", "নালিশি সম্পত্তি", "তফসিল বর্ণিত"। তবে প্রচলিত শব্দের পাশাপাশি সহজ ও স্পষ্ট বাক্য ব্যবহার করাই আধুনিক ড্রাফটিংয়ের প্রবণতা। দীর্ঘ জটিল বাক্যের বদলে ছোট বাক্য, প্রতিটি অনুচ্ছেদে একটি তথ্য এবং ধারাবাহিক সময়ক্রম আরজিকে বিচারকের জন্য সহজপাঠ্য করে। আইনি লেখার সাধারণ নীতি নিয়ে পড়ুন Legal writing আর সাধারণ লেখার পার্থক্য।
লিখিত জবাবের সঙ্গে সম্পর্ক
আরজির জবাবে বিবাদী লিখিত জবাব (written statement) দাখিল করেন, যেখানে তিনি আরজির প্রতিটি দাবি স্বীকার বা অস্বীকার করেন এবং নিজের পক্ষের তথ্য তুলে ধরেন। আদালত আরজি ও জবাব মিলিয়ে বিচার্য বিষয় (issues) নির্ধারণ করেন। তাই আরজি লেখার সময়ই ভাবতে হয়, বিবাদী কোন কোন বিষয় অস্বীকার করতে পারেন এবং সেগুলোর বিপরীতে বাদীর তথ্য আরজিতে যথেষ্ট স্পষ্ট আছে কি না। আরজিতে অনুল্লিখিত তথ্য পরে সাক্ষ্যে আনতে গেলে আপত্তি উঠতে পারে।
একটি ছোট অনুশীলনী
নিচের ঘটনা থেকে মামলার কারণের অনুচ্ছেদটি নিজে লিখে দেখুন: "করিম ২০২০ সালে নিবন্ধিত দলিলে ১০ শতাংশ জমি কিনে নামজারি করেছেন এবং তখন থেকে চাষ করছেন। গত ৫ মার্চ প্রতিবেশী জসিম জমির উত্তর পাশে বেড়া দিয়ে দুই শতাংশ নিজের বলে দাবি করেছেন।" ভালো উত্তরে থাকবে করিমের মালিকানার উৎস, দখলের ধারাবাহিকতা, জসিমের নির্দিষ্ট কাজ, তারিখ ও স্থান, এবং এর ফলে করিমের কোন অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এরপর ভাবুন, প্রার্থনায় কোন কোন প্রতিকার চাইবেন: মালিকানার ঘোষণা, বেড়া অপসারণসহ দখল পুনরুদ্ধার, নাকি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।
আরজি খারিজ ও ফেরত
আদেশ ৭ নিয়ম ১১: খারিজের কারণ
- আরজিতে মামলার কারণ প্রকাশ পায় না;
- প্রতিকার কম মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও সংশোধন করা হয়নি;
- পর্যাপ্ত কোর্ট ফি দেওয়া হয়নি এবং নির্দেশ সত্ত্বেও ঘাটতি পূরণ হয়নি;
- আরজির বক্তব্য থেকেই মামলাটি কোনো আইনে বারিত বলে প্রতীয়মান হয়, যেমন তামাদিতে বারিত।
আদেশ ৭ নিয়ম ১০: ফেরত
আদালতের এখতিয়ার না থাকলে আরজি খারিজ নয়, বরং উপযুক্ত আদালতে দাখিলের জন্য ফেরত দেওয়া হয়।
সংশোধন
আদেশ ৬ নিয়ম ১৭ অনুযায়ী আদালত ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে মামলার যেকোনো পর্যায়ে আরজি সংশোধনের অনুমতি দিতে পারেন, তবে সংশোধন যেন মামলার প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে না দেয় বা প্রতিপক্ষের অর্জিত অধিকার ক্ষুণ্ন না করে।
আরজি লেখার আগে মক্কেলের সঙ্গে যা নিশ্চিত করবেন
- মালিকানা বা দাবির উৎসের মূল দলিল দেখেছেন কি না;
- বিবাদীর সঠিক নাম ও বর্তমান ঠিকানা, যাতে পরে সমন জারি নিয়ে জটিলতা না হয়;
- একই বিষয়ে আগে কোনো মামলা হয়েছে বা চলছে কি না, কারণ res judicata ও res sub judice নীতি প্রযোজ্য হতে পারে; দেখুন Res Sub Judice ও Res Judicata-র পার্থক্য;
- মামলার কারণ কবে উদ্ভূত হয়েছে এবং তামাদির সময় পার হয়নি তো;
- আগে আইনি নোটিশ পাঠানো জরুরি কি না, যেমন সরকারের বিরুদ্ধে মামলায় দেওয়ানি কার্যবিধির ৮০ ধারার নোটিশ।
এই প্রাথমিক যাচাই আরজি লেখার আগেই সম্পন্ন করলে পরবর্তী সংশোধন, খারিজের ঝুঁকি এবং মক্কেলের অর্থ ও সময়ের অপচয় অনেকাংশে এড়ানো যায়।
নবীন ড্রাফটারের সাধারণ ভুল
- মক্কেলের মুখের কথা যাচাই না করে আরজিতে লিখে ফেলা।
- ঘটনা অগোছালোভাবে, সময়ক্রম ভেঙে লেখা।
- প্রমাণ, যুক্তি বা আইনের দীর্ঘ উদ্ধৃতি আরজিতে ঢুকিয়ে দেওয়া।
- প্রয়োজনীয় পক্ষ বাদ দেওয়া, যেমন বাটোয়ারা মামলায় কোনো শরিক।
- তফসিলে দাগ নম্বর বা চৌহদ্দিতে ভুল।
- প্রার্থনায় প্রয়োজনীয় প্রতিকার, যেমন নিষেধাজ্ঞা বা খরচ, বাদ পড়া।
- মামলার কারণ উদ্ভবের তারিখ অস্পষ্ট রাখা।
কীভাবে দক্ষতা বাড়াবেন
ড্রাফটিং শেখার সেরা উপায় হলো অভিজ্ঞ আইনজীবীর লেখা আরজি পড়া, নিজে একই ঘটনায় খসড়া লিখে তুলনা করা এবং নিয়মিত অনুশীলন। ড্রাফটিংয়ের সাধারণ নীতি জানতে পড়ুন Legal drafting কী এবং শিক্ষার্থী কীভাবে অনুশীলন শুরু করবে।
নিয়মিত অনুশীলন, অভিজ্ঞদের লেখা পর্যালোচনা এবং প্রতিটি খসড়া নিজে আবার পড়ে সংশোধন করার অভ্যাসই একজন নবীন আইনজীবীকে দক্ষ ড্রাফটারে পরিণত করে।
শেষ কথা
একটি ভালো আরজি গল্প বলে না, মামলা গড়ে। এতে থাকে স্পষ্ট অধিকার, সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন, সঠিক এখতিয়ার এবং সম্পূর্ণ প্রার্থনা। আরজি লেখার সময় সবসময় মনে রাখুন, প্রতিপক্ষের আইনজীবী প্রথমেই খুঁজবেন আরজি খারিজের কোনো সুযোগ আছে কি না; সেই সুযোগ না দেওয়াই দক্ষ ড্রাফটিংয়ের মূল লক্ষ্য।

মন্তব্যসমূহ (০)