j
LLB

Doctrine of Frustration কী? চুক্তি আইনের ৫৬ ধারা অনুযায়ী ব্যাখ্যা কর

ছেঁড়া চুক্তিপত্রের প্রতীক, ঘড়ি ও লাল-সবুজ চিহ্নের পাশে চুক্তি আইন নিয়ে ভাবছে একজন শিক্ষার্থী—কার্টুন চিত্র
প্রতীকী ছবি: LLB

মূল পয়েন্ট

  • চুক্তি করার পর অপ্রত্যাশিত ঘটনায় তা অসম্ভব বা বেআইনি হলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায়—এটাই frustration
  • চুক্তি আইনের ৫৬ ধারার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ এই নীতির বিধিবদ্ধ ভিত্তি
  • শুধু খরচ বৃদ্ধি বা কষ্টসাধ্যতা frustration নয়; চুক্তির ভিত্তিই নষ্ট হতে হয়
  • নিজের কাজের ফলে সৃষ্ট অসম্ভবতা frustration হিসেবে গণ্য হয় না

ধরুন, একটি অনুষ্ঠানের জন্য একটি মিলনায়তন ভাড়া নেওয়া হলো। অনুষ্ঠানের আগের রাতে আগুনে মিলনায়তনটি পুড়ে গেল। কোনো পক্ষেরই দোষ নেই, অথচ চুক্তি পালন করা এখন অসম্ভব। ভাড়াটিয়া কি অগ্রিম ফেরত পাবেন? মালিক কি চুক্তিভঙ্গের জন্য দায়ী? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয় চুক্তি আইনের doctrine of frustration।

Frustration কী

চুক্তি সম্পাদনের পর এমন কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে, যার জন্য কোনো পক্ষ দায়ী নয় এবং যার ফলে চুক্তি পালন অসম্ভব, বেআইনি বা চুক্তির মূল উদ্দেশ্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু হয়ে যায়—তখন চুক্তিটি সেই মুহূর্ত থেকে বাতিল হয়ে যায় এবং পক্ষগুলো ভবিষ্যৎ দায় থেকে অব্যাহতি পায়। একেই frustration বা চুক্তির অসম্ভবতা বলা হয়।

চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ৫৬ ধারা

বাংলাদেশে frustration-এর বিধিবদ্ধ ভিত্তি চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ৫৬ ধারা। ধারাটির তিনটি অংশ:

  1. প্রথম অনুচ্ছেদ: নিজেই অসম্ভব কোনো কাজ করার চুক্তি বাতিল (void)। এটি প্রাথমিক অসম্ভবতা (initial impossibility)। যেমন জাদুর মাধ্যমে কিছু করার চুক্তি।
  2. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: চুক্তি করার পর যে কাজ অসম্ভব হয়ে যায়, অথবা প্রতিশ্রুতিদাতা প্রতিরোধ করতে পারেন না এমন কোনো ঘটনার কারণে বেআইনি হয়ে যায়, সেই কাজ করার চুক্তি তখন থেকে বাতিল হয়। এটিই frustration-এর মূল বিধান।
  3. তৃতীয় অনুচ্ছেদ: প্রতিশ্রুতিদাতা জানতেন বা যুক্তিসংগত পরিশ্রমে জানতে পারতেন যে কাজটি অসম্ভব বা বেআইনি, কিন্তু প্রতিশ্রুতিগ্রহীতা জানতেন না—এমন ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিদাতাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

আইনের মূল পাঠ দেখতে পারেন bdlaws.minlaw.gov.bd-এ।

Frustration-এর উপাদান

  • বৈধ ও বিদ্যমান চুক্তি: চুক্তিটি শুরুতে বৈধ ছিল এবং এখনো সম্পূর্ণ পালিত হয়নি।
  • পরবর্তী ঘটনা: চুক্তি সম্পাদনের পরে ঘটনাটি ঘটেছে।
  • অপ্রত্যাশিততা: চুক্তির সময় পক্ষরা ঘটনাটি যুক্তিসংগতভাবে প্রত্যাশা করেননি বা চুক্তিতে এর ব্যবস্থা রাখেননি।
  • পক্ষের দোষ না থাকা: যে পক্ষ frustration দাবি করছেন, ঘটনাটি তাঁর নিজের কাজ বা অবহেলায় ঘটেনি।
  • মৌলিক পরিবর্তন: পালন অসম্ভব, বেআইনি, অথবা চুক্তির উদ্দেশ্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ নজির

Taylor v Caldwell (1863)

কনসার্টের জন্য একটি মিউজিক হল ভাড়া নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনুষ্ঠানের আগে হলটি আগুনে পুড়ে যায়। ইংরেজ আদালত বলেন, চুক্তির বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব চুক্তির একটি অন্তর্নিহিত শর্ত। তা ধ্বংস হলে দুই পক্ষই দায় থেকে মুক্ত। আধুনিক frustration নীতির সূচনা হিসেবে এই মামলা বিবেচিত।

Krell v Henry (1903)

রাজ্যাভিষেকের শোভাযাত্রা দেখার জন্য একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। রাজার অসুস্থতায় শোভাযাত্রা বাতিল হয়। ঘরটি তখনো ব্যবহারযোগ্য ছিল, কিন্তু আদালত বলেন চুক্তির মূল ভিত্তিই ছিল শোভাযাত্রা দেখা। তা না থাকায় চুক্তির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ শারীরিক অসম্ভবতা ছাড়াও উদ্দেশ্যের ব্যর্থতা frustration হতে পারে।

Satyabrata Ghose v Mugneeram Bangur (1954)

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের ৫৬ ধারা ব্যাখ্যা করে বলেন, "অসম্ভব" শব্দটি শুধু আক্ষরিক বা শারীরিক অসম্ভবতা নয়। চুক্তির উদ্দেশ্য ও পক্ষদের লক্ষ্যের আলোকে কাজটি অবাস্তব বা অর্থহীন হয়ে গেলেও তা অসম্ভব বলে গণ্য হতে পারে। আদালত আরও বলেন, এই বিষয়ে ৫৬ ধারাই নির্ধারক বিধান। উপমহাদেশে একই আইনের উত্তরাধিকার থাকায় মামলাটি বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমেও বহুল আলোচিত, যদিও এটি এখানে বাধ্যতামূলক নজির নয়।

যেসব পরিস্থিতি frustration নয়

  • শুধু খরচ বা কষ্ট বৃদ্ধি: কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া বা লাভ কমে যাওয়া। ইংরেজি মামলা Davis Contractors v Fareham UDC (1956)-এ শ্রমিক সংকটে নির্মাণকাজ বেশি সময় ও খরচসাপেক্ষ হলেও তা frustration হিসেবে গণ্য হয়নি।
  • নিজ কাজে সৃষ্ট অসম্ভবতা (self-induced frustration): পক্ষ নিজের সিদ্ধান্তে পালন অসম্ভব করলে তা frustration নয়। Maritime National Fish v Ocean Trawlers (1935) এর পরিচিত উদাহরণ।
  • প্রত্যাশিত ঝুঁকি: চুক্তিতে যে ঝুঁকির কথা ভাবা হয়েছিল বা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
  • বিকল্প পথে পালন সম্ভব হলে: নির্দিষ্ট পথ বন্ধ, কিন্তু যুক্তিসংগত বিকল্পে চুক্তি পালন করা যায়।

Frustration-এর ফল ও ৬৫ ধারা

Frustration ঘটলে চুক্তি ঘটনার মুহূর্ত থেকে বাতিল হয়। আগে পালিত দায় থেকে যায়, কিন্তু ভবিষ্যৎ দায় থেকে পক্ষরা মুক্ত হন। চুক্তি আইনের ৬৫ ধারা অনুযায়ী কোনো চুক্তি বাতিল আবিষ্কৃত হলে বা বাতিল হয়ে গেলে, যিনি সেই চুক্তির অধীনে কোনো সুবিধা পেয়েছেন, তাঁকে তা ফেরত দিতে বা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ফলে শুরুর উদাহরণে মিলনায়তনের অগ্রিম ভাড়া সাধারণত ফেরতযোগ্য।

Force majeure ধারার সঙ্গে সম্পর্ক

আধুনিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে প্রায়ই force majeure ধারা থাকে, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, মহামারি বা সরকারি নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনায় কী হবে তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এ ধরনের ধারা থাকলে আদালত সাধারণত আগে চুক্তির শর্ত দেখেন। কারণ পক্ষরা নিজেরাই ঝুঁকি বণ্টন করে নিয়েছেন। চুক্তিতে যে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটা বা না ঘটার শর্ত থাকে, তা শর্তসাপেক্ষ চুক্তির (contingent contract) নিয়মেও বিবেচিত হতে পারে। চুক্তির মৌলিক উপাদান নিয়ে পড়ুন চুক্তি কী? একটি বৈধ চুক্তির অপরিহার্য উপাদান।

একটি সমস্যাভিত্তিক উদাহরণ

ক একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট পণ্য রপ্তানির চুক্তি করল। চুক্তির পর সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই পণ্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করল। এখানে চুক্তি পালন বেআইনি হয়ে গেছে এবং ক এই ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারত না। ৫৬ ধারার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চুক্তিটি বাতিল হবে, আর অগ্রিম মূল্য নেওয়া থাকলে ৬৫ ধারা অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে। তবে চুক্তির সময় নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আগে থেকেই আলোচনায় ছিল এবং ক তা জানত—এমন হলে প্রত্যাশিত ঝুঁকি ও তৃতীয় অনুচ্ছেদের প্রশ্ন উঠবে।

পরীক্ষায় উত্তর লেখার কাঠামো

  1. একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে frustration-এর সংজ্ঞা।
  2. ৫৬ ধারার তিনটি অনুচ্ছেদ।
  3. উপাদানগুলো।
  4. নজির: Taylor v Caldwell, Krell v Henry, Satyabrata Ghose।
  5. যেসব ক্ষেত্রে frustration প্রযোজ্য নয়।
  6. ফল ও ৬৫ ধারা।
  7. উপসংহার।

চুক্তিভঙ্গে আদালত কখন চুক্তি পালনের আদেশ দেন, তা জানতে পড়ুন Specific Performance of Contract।

উপসংহার

Frustration নীতি চুক্তির পবিত্রতা আর বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখে। একদিকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা চুক্তি আইনের মূল কথা, অন্যদিকে কারও দোষ ছাড়া অসম্ভব হয়ে যাওয়া কাজের জন্য কাউকে দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়। ৫৬ ধারা এই ভারসাম্যের বিধিবদ্ধ রূপ, আর আদালত এর সীমা কঠোরভাবে টেনেছেন যাতে শুধু অসুবিধা বা লোকসানের অজুহাতে চুক্তি এড়ানো না যায়।

শেয়ার করুন:
Legal Desk

Legal Desk

BDLawsDaily Legal Desk বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিধি ও গুরুত্বপূর্ণ রায় বিশ্লেষণ করে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ও নাগরিকের প্রয়োজনীয় আইনগত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করে।

মন্তব্যসমূহ (০)