টাকার প্রয়োজনে অনেকেই জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেন—কখনো ব্যাংক থেকে, কখনো পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে। কিন্তু সঠিক আইনগত প্রক্রিয়া না মেনে বন্ধক দিলে বা নিলে পরবর্তীতে জমি হারানো বা টাকা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বন্ধক (Mortgage) বলতে কী বোঝায়
হস্তান্তর সম্পত্তি আইন, ১৮৮২ অনুযায়ী বন্ধক হলো ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির ওপর একটি স্বার্থ হস্তান্তর করা, যেখানে সম্পত্তির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধকগ্রহীতার কাছে যায় না, বরং ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর একটি আইনগত দাবি তৈরি হয়।
বন্ধকের প্রধান ধরন
- সিম্পল মর্টগেজ: সম্পত্তির দখল বন্ধকদাতার কাছেই থাকে, শুধু ঋণ শোধ না হলে সম্পত্তি বিক্রি করার অধিকার বন্ধকগ্রহীতা পান।
- ইংলিশ মর্টগেজ: নির্দিষ্ট তারিখে ঋণ পরিশোধের শর্তে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়, ব্যাংকঋণে এই ধরন বেশি দেখা যায়।
- শর্তসাপেক্ষ বিক্রয় হিসেবে বন্ধক: কাগজে-কলমে বিক্রয়ের মতো দেখতে হলেও শর্ত থাকে যে নির্দিষ্ট সময়ে টাকা ফেরত দিলে সম্পত্তি ফেরত পাওয়া যাবে।
সঠিক প্রক্রিয়া কী হওয়া উচিত
- বন্ধক দেওয়ার আগে জমির দলিল ও মালিকানা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে জমিটি বন্ধকদাতার নিজস্ব ও বিরোধমুক্ত কিনা।
- বন্ধকনামা রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করাতে হবে—রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্যের ঊর্ধ্বে বন্ধক দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
- দলিলে ঋণের পরিমাণ, সুদের হার (যদি থাকে), পরিশোধের সময়সীমা ও শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
- ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধের পর বন্ধক প্রত্যাহারপত্র (Deed of Release) রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধ না হয়।
যে ভুলগুলোর কারণে প্রতারিত হন মানুষ
- মৌখিক বা সাদা কাগজে বন্ধকের চুক্তি করা, যা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন।
- প্রকৃতপক্ষে বন্ধক হলেও কাগজে সরাসরি বিক্রয় দলিল (সাফ কবলা) করিয়ে নেওয়া—এতে ঋণ শোধ করলেও জমি ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই না করেই বন্ধক নেওয়া, যেখানে পরে দেখা যায় জমিতে একাধিক দাবিদার আছে।
ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
ব্যাংক থেকে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার সময় ঋণ পরিশোধের কিস্তির শর্ত, ব্যর্থ হলে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী নিলামের সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি। ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক আদালতের মাধ্যমে বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে পাওনা আদায় করতে পারে।
জমি বন্ধক একটি স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন হলেও, প্রতিটি ধাপে লিখিত ও নিবন্ধিত দলিল ছাড়া এগোনো উচিত নয়। সন্দেহ থাকলে বন্ধকনামা তৈরির আগে একজন আইনজীবীকে দিয়ে দলিল যাচাই করিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

মন্তব্যসমূহ (০)