দলিল ও খতিয়ান ঠিক থাকলেই জমি কেনা সম্পূর্ণ নিরাপদ — এই ধারণা সবসময় ঠিক নয়। কাগজ সঠিক থাকা সত্ত্বেও দখল, সীমানা বা বিক্রেতার প্রকৃত বিক্রয়ক্ষমতা নিয়ে সমস্যা থাকলে ক্রেতাকে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। দলিল ও মালিকানার কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করবেন তা নিয়ে BD Laws Daily-তে আগে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে — পড়ুন জমি কেনার আগে দলিল ও মালিকানা যাচাইয়ের সঠিক নিয়ম। এই প্রতিবেদনে সেই কাগজপত্র-ভিত্তিক যাচাইয়ের বাইরে, সরেজমিনে ও ব্যবহারিকভাবে যা যাচাই করা জরুরি তা নিয়ে আলোচনা করা হলো — একটি হাতে-কলমে চেকলিস্ট হিসেবে।
দখল যাচাই কেন জরুরি — কাগজ ঠিক থাকলেও
বাংলাদেশে জমির মালিকানার দলিল থাকা এক বিষয়, আর প্রকৃত দখলে থাকা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি জমি থেকে বেদখল হওয়ার পর ১২ বছরের মধ্যে দখল ফিরে পাওয়ার মামলা না করলে, আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী সেই জমির উপর তার অধিকারই বিলুপ্ত হয়ে যায় — এবং দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা অন্য কোনো ব্যক্তি "প্রতিকূল দখলের" (adverse possession) মাধ্যমে অধিকার দাবি করতে পারেন। অর্থাৎ দলিলে যার নাম আছে তিনিই সবসময় প্রকৃত দখলদার — এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাই জমি কেনার আগে সরেজমিনে গিয়ে দেখা উচিত, বিক্রেতা নিজে দখলে আছেন কি না, নাকি অন্য কেউ দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করছেন।
জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে মেলানো
দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি বাস্তবের সঙ্গে মিলছে কি না, তা একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমিন বা সার্ভেয়ারের মাধ্যমে সরেজমিনে মেপে যাচাই করা উচিত। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে সংরক্ষিত মৌজা ম্যাপের সঙ্গে দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখাও জরুরি। প্রতিবেশী দাগের সঙ্গে সীমানা নিয়ে কোনো অমীমাংসিত বিরোধ আছে কি না তা প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেওয়া উচিত — কারণ সীমানা বিরোধ পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি মামলার কারণ হতে পারে।
বিক্রেতার প্রকৃত বিক্রয়ক্ষমতা: একাধিক ওয়ারিশ থাকলে সতর্কতা
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে সাধারণত একাধিক ওয়ারিশ যৌথ অংশীদার (co-sharer) থাকেন। আনুষ্ঠানিক বণ্টননামা বা বণ্টন মামলার মাধ্যমে জমি ভাগ করা না হলে, একজন ওয়ারিশ শুধু নিজের অংশটুকুরই মালিক — পুরো জমি বিক্রি করার আইনগত ক্ষমতা তার একার থাকে না। এক্ষেত্রে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি বা স্বাক্ষর ছাড়া জমি কিনলে পরবর্তীতে অন্য ওয়ারিশরা মালিকানা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রি-এম্পশন বা অগ্রক্রয়াধিকার। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো হোল্ডিংয়ের অংশীদার (co-sharer) ব্যক্তি, সেই হোল্ডিংয়ের কোনো অংশ কোনো বহিরাগত (অ-অংশীদার) ব্যক্তির কাছে বিক্রি হলে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আদালতে আবেদন করে সেই জমি নিজের কাছে বিক্রি করানোর আইনগত অধিকার রাখেন। অর্থাৎ বিক্রেতা যদি একাধিক ওয়ারিশের একজন হন এবং ক্রেতা তাদের কেউ না হন, তাহলে পরবর্তীতে অন্য ওয়ারিশরা আদালতের মাধ্যমে জমিটি ক্রেতার কাছ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন করতে পারেন। জমি কেনার আগে তাই যাচাই করা জরুরি, বিক্রেতা একমাত্র মালিক নাকি একাধিক ওয়ারিশের একজন, এবং সেক্ষেত্রে অন্য অংশীদাররা বিক্রয়ে সম্মত কি না।
সরকারি অধিগ্রহণের আওতায় আছে কি না
অধিগ্রহণ ও রিক্যুইজিশন আইন, ২০১৭ অনুযায়ী কোনো জমি সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নথিভুক্ত থাকে। জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত, জমিটি কোনো সরকারি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার আওতায় নেই।
যেসব ক্ষেত্রে জমি কেনা থেকে বিরত থাকা উচিত
- বিক্রেতা দখলে নেই এবং দখল কার কাছে আছে তা স্পষ্ট নয়।
- জমির প্রকৃত পরিমাণ বা সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে অমীমাংসিত বিরোধ আছে।
- একাধিক ওয়ারিশের একজন একাই সম্পূর্ণ জমি বিক্রি করছেন, অন্যদের সম্মতি ছাড়া।
- জমিটি সরকারি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার আওতায় বা বিরোধপূর্ণ বলে জানা যাচ্ছে।
- বিক্রেতা মূল দলিল দেখাতে অস্বীকার করছেন বা শুধু ফটোকপি দেখাচ্ছেন — এটি জমি বন্ধক থাকার ইঙ্গিত হতে পারে।
ক্রেতার চূড়ান্ত ফিল্ড চেকলিস্ট
- সরেজমিনে গিয়ে বিক্রেতার প্রকৃত দখল যাচাই করা হয়েছে
- আমিন/সার্ভেয়ারের মাধ্যমে জমির পরিমাণ ও সীমানা মাপা হয়েছে
- মৌজা ম্যাপের সঙ্গে দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখা হয়েছে
- প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমানা বিরোধ আছে কি না জানা হয়েছে
- বিক্রেতা একমাত্র মালিক না একাধিক ওয়ারিশের একজন তা নিশ্চিত হওয়া হয়েছে
- একাধিক ওয়ারিশ থাকলে সবার লিখিত সম্মতি আছে কি না যাচাই করা হয়েছে
- সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে সরকারি অধিগ্রহণের আওতায় আছে কি না খোঁজ নেওয়া হয়েছে
- দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও দায়মুক্ত সনদ যাচাই করা হয়েছে (বিস্তারিত পড়ুন এই প্রতিবেদনে)
জমি কেনা একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, আর উপরের বিষয়গুলো দলিলপত্রের বাইরেও বাস্তবে যাচাই করা প্রয়োজন। বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি যাচাই করিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ — বিশেষত একাধিক ওয়ারিশ বা অগ্রক্রয়াধিকার সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে।

মন্তব্যসমূহ (০)