j
আইন পরীক্ষা

সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন সমাধান কর: প্রস্তাব প্রত্যাহার (Revocation of Offer) কখন কার্যকর হয়?

প্রস্তাব প্রত্যাহারের নিয়ম বোঝাতে চিঠি ও চুক্তিপত্রের প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি: আইন পরীক্ষা

মূল পয়েন্ট

  • চুক্তি আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, গ্রহণকারীর কাছে যোগাযোগ সম্পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রস্তাব প্রত্যাহার করা যায়
  • ডাকযোগে পাঠানো গ্রহণপত্রের ক্ষেত্রে, তা পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তাবদাতার প্রতি যোগাযোগ সম্পন্ন ধরা হয় (postal rule)
  • প্রস্তাব প্রত্যাহারের নোটিশ গ্রহণকারীর কাছে গ্রহণপত্র পাঠানোর আগেই পৌঁছাতে হবে
  • সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে FACTS-ISSUE-LAW-APPLICATION-CONCLUSION কাঠামো অনুসরণ করলে উত্তর সুশৃঙ্খল হয়

সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন সমাধান কর: প্রস্তাব প্রত্যাহার কখন কার্যকর হয়?

প্রশ্ন: ক (প্রস্তাবদাতা) ১লা তারিখে ডাকযোগে খ-কে একটি পণ্য বিক্রির প্রস্তাব পাঠায়। খ ৪ঠা তারিখে প্রস্তাবটি পেয়ে সেদিনই ডাকযোগে গ্রহণপত্র (Acceptance) পাঠায়, যা ৬ষ্ঠ তারিখে ক-এর কাছে পৌঁছায়। কিন্তু ক ৫ম তারিখে একটি টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রস্তাব প্রত্যাহারের নোটিশ পাঠায়, যা খ-এর কাছে ৭ম তারিখে পৌঁছায়। প্রশ্ন হলো — এই চুক্তি কি সম্পন্ন হয়েছে?

সরাসরি উত্তর

হ্যাঁ, এই ক্ষেত্রে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে, কারণ চুক্তি আইনের নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাব প্রত্যাহারের নোটিশ গ্রহণকারীর কাছে তার গ্রহণপত্র পাঠানোর আগেই পৌঁছাতে হবে — এই ক্ষেত্রে খ ইতিমধ্যে ৪ঠা তারিখেই গ্রহণপত্র পোস্ট করে ফেলেছিল, যা ক-এর প্রত্যাহার নোটিশ পাঠানোর (৫ম তারিখ) আগেই ঘটেছে।

Issue (আইনি প্রশ্ন)

মূল আইনি প্রশ্ন হলো — ডাকযোগে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রস্তাব ও গ্রহণ কখন "সম্পন্ন" (complete) বলে গণ্য হয়, এবং প্রস্তাবদাতার প্রত্যাহার নোটিশ কখন কার্যকর হয়।

প্রযোজ্য আইন ও মামলা

চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৫ অনুযায়ী, প্রস্তাবদাতা তার গ্রহণপত্র সম্পূর্ণরূপে গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে (against the acceptor) কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে পারেন। ধারা ৪ অনুযায়ী —

  • প্রস্তাবের যোগাযোগ সম্পূর্ণ হয় যখন তা গ্রহণকারীর জ্ঞানে আসে।
  • গ্রহণপত্রের যোগাযোগ প্রস্তাবদাতার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ হয় যখন তা ডাকযোগে পোস্ট করা হয় (এই নীতি সাধারণত "postal rule" নামে পরিচিত এবং ইংরেজি সাধারণ আইনের Adams v Lindsell (1818) মামলায় প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ) — অর্থাৎ, প্রস্তাবদাতা এই মুহূর্ত থেকে চুক্তিতে আবদ্ধ বলে গণ্য হন, যদিও গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে তা তখনই কার্যকর হয় না যতক্ষণ না তা প্রস্তাবদাতার জ্ঞানে আসে।

প্রস্তাব প্রত্যাহার সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে ইংরেজি সাধারণ আইনের Byrne v Van Tienhoven (1880) মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, প্রত্যাহারের নোটিশ কার্যকর হতে হলে তা গ্রহণকারীর প্রকৃত জ্ঞানে পৌঁছাতে হবে — নিছক প্রত্যাহারপত্র পাঠানোই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের চুক্তি আইনের ধারা ৪ ও ৫-এর কাঠামোও একই মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

Application (আইনের প্রয়োগ)

এই ঘটনায় খ ৪ঠা তারিখে গ্রহণপত্র পোস্ট করেছিল — ধারা ৪ অনুযায়ী, এই মুহূর্ত থেকেই ক (প্রস্তাবদাতা)-এর বিরুদ্ধে গ্রহণ কার্যকর হয়ে যায়, যদিও তা ক-এর কাছে পৌঁছেছিল ৬ষ্ঠ তারিখে। অন্যদিকে, ক-এর প্রত্যাহার নোটিশ খ-এর কাছে পৌঁছেছিল ৭ম তারিখে — অর্থাৎ, গ্রহণপত্র পোস্ট হওয়ার (৪ঠা তারিখ) অনেক পরে। ধারা ৫ ও Byrne v Van Tienhoven মামলার নীতি অনুযায়ী প্রত্যাহার নোটিশ গ্রহণকারীর গ্রহণপত্র পাঠানোর আগেই পৌঁছাতে হতো, যা এখানে ঘটেনি।

Conclusion (সিদ্ধান্ত)

যেহেতু খ-এর গ্রহণপত্র পোস্ট হওয়ার সময় (৪ঠা তারিখ) থেকেই ক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান, এবং ক-এর প্রত্যাহার নোটিশ তার অনেক পরে পৌঁছেছে, তাই আইনের দৃষ্টিতে একটি বৈধ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে। ক এই চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে আসতে পারবেন না এবং চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী হতে পারেন।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ও সতর্কতা

উল্লেখ্য, postal rule কেবল সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে ডাক ব্যবহারের মাধ্যম উভয় পক্ষের কাছে যুক্তিসঙ্গত ও প্রত্যাশিত ছিল। যদি প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে গ্রহণ তখনই কার্যকর হবে যখন তা প্রস্তাবদাতার কাছে প্রকৃতপক্ষে পৌঁছাবে, তাহলে সাধারণ postal rule প্রযোজ্য হবে না — প্রস্তাবদাতার নির্ধারিত শর্তই প্রাধান্য পাবে।

Adams v Lindsell মামলার প্রেক্ষাপট

Adams v Lindsell (1818) মামলাটি postal rule প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মামলায় বিবাদী পক্ষ ডাকযোগে পশমের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এবং বাদী পক্ষ তা গ্রহণ করে ডাকযোগে গ্রহণপত্র পাঠান। কিন্তু ডাক পরিবহনে বিলম্বের কারণে বিবাদী পক্ষ ইতিমধ্যে পণ্যটি অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, এই ধারণা থেকে যে যেহেতু গ্রহণপত্র তখনও তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, তাই কোনো চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। আদালত এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে সিদ্ধান্ত দেয় যে, গ্রহণকারী যখনই বৈধভাবে ডাকযোগে গ্রহণপত্র পোস্ট করেন, তখনই চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যায় — প্রস্তাবদাতার কাছে তা পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এই নীতিই পরবর্তীতে অধিকাংশ কমন-ল জুরিসডিকশনে (বাংলাদেশসহ) গৃহীত হয়েছে এবং চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৪-এ এর প্রতিফলন দেখা যায়।

বিকল্প পরিস্থিতি বিশ্লেষণ

এই ধরনের সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে সামান্য তথ্য পরিবর্তন করলেই উত্তর সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যেতে পারে — পরীক্ষায় এই সংবেদনশীলতা বোঝানো গুরুত্বপূর্ণ।

পরিস্থিতি ১: প্রত্যাহার নোটিশ যদি ৩য় তারিখে পৌঁছাত

এক্ষেত্রে খ তখনও গ্রহণপত্র পোস্ট করেনি (যা করেছিল ৪ঠা তারিখে), ফলে ধারা ৫ অনুযায়ী প্রত্যাহার তখনও কার্যকর করা সম্ভব ছিল, এবং কোনো বৈধ চুক্তি সম্পন্ন হতো না।

পরিস্থিতি ২: যদি খ ফোনে বা তাৎক্ষণিক বার্তায় গ্রহণ জানাত

টেলিফোন, ফ্যাক্স বা ইমেইলের মতো তাৎক্ষণিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণত postal rule প্রযোজ্য হয় না — এসব ক্ষেত্রে গ্রহণ তখনই সম্পন্ন ধরা হয় যখন তা প্রকৃতপক্ষে প্রস্তাবদাতার কাছে পৌঁছায় এবং তিনি তা জানতে পারেন, পাঠানোর মুহূর্তে নয়। ফলে বিশ্লেষণের পদ্ধতি ভিন্ন হয়ে যায়।

পরিস্থিতি ৩: যদি প্রস্তাবেই শর্ত থাকত যে ডাকযোগে গ্রহণ চলবে না

প্রস্তাবদাতা যদি সুনির্দিষ্টভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গ্রহণ জানানোর শর্ত দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই শর্ত মেনে গ্রহণ জানানো আবশ্যক — অন্যথায় গ্রহণ কার্যকর নাও হতে পারে, এমনকি তা ডাকযোগেই পাঠানো হলেও।

পরীক্ষার খাতায় কীভাবে লিখবেন

সমস্যাভিত্তিক (Problem) প্রশ্নে সরাসরি আইনি সিদ্ধান্তে না গিয়ে প্রথমে Facts সংক্ষেপে পুনরায় তুলে ধরুন, এরপর মূল Issue চিহ্নিত করুন, প্রাসঙ্গিক ধারা ও মামলা উদ্ধৃত করুন এবং সবশেষে ধাপে ধাপে তথ্যের সঙ্গে আইন প্রয়োগ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এই FACTS-ISSUE-LAW-APPLICATION-CONCLUSION কাঠামো পরীক্ষকের কাছে যুক্তির স্বচ্ছতা তুলে ধরে এবং সরাসরি উত্তর দেওয়ার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

যদি ক-এর প্রত্যাহার নোটিশ ৩য় তারিখে পৌঁছাত, তাহলে কী হতো?

সেক্ষেত্রে খ-এর গ্রহণপত্র পোস্ট করার (৪ঠা তারিখ) আগেই প্রত্যাহার কার্যকর হয়ে যেত, ফলে কোনো বৈধ চুক্তি সম্পন্ন হতো না।

ইমেইল বা মোবাইল বার্তার ক্ষেত্রে কি একই postal rule প্রযোজ্য?

তাৎক্ষণিক যোগাযোগ মাধ্যমের (instantaneous communication) ক্ষেত্রে সাধারণত postal rule প্রযোজ্য হয় না — সেখানে যোগাযোগ তখনই সম্পূর্ণ ধরা হয় যখন তা প্রকৃতপক্ষে গ্রহীতার কাছে পৌঁছায়।

সংক্ষিপ্তভাবে মনে রাখার বিষয়

  • ধারা ৪ — ডাকযোগে গ্রহণপত্র পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তাবদাতার বিরুদ্ধে যোগাযোগ সম্পন্ন
  • ধারা ৫ — গ্রহণপত্র পাঠানোর আগেই প্রত্যাহার নোটিশ পৌঁছাতে হবে
  • Byrne v Van Tienhoven — প্রত্যাহার কার্যকর হতে প্রকৃত জ্ঞান প্রয়োজন
  • সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে সবসময় FACTS → ISSUE → LAW → APPLICATION → CONCLUSION কাঠামো অনুসরণ করুন
শেয়ার করুন:
Legal Desk

Legal Desk

BDLawsDaily Legal Desk বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিধি ও গুরুত্বপূর্ণ রায় বিশ্লেষণ করে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ও নাগরিকের প্রয়োজনীয় আইনগত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করে।

মন্তব্যসমূহ (০)