জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হয়েছে সরকারি ক্রয় (সংশোধন) আইন, ২০২৬ — প্রায় দুই দশক পুরনো সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর একটি উদ্যোগ। প্রতিবছর সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার, ক্রয় ও নির্মাণকাজ এই আইনের অধীনেই পরিচালিত হয়, তাই এই সংশোধনী সরাসরি প্রভাব ফেলবে সরকারি প্রকল্পের মান, খরচ ও স্বচ্ছতার উপর — এবং পরোক্ষভাবে প্রতিটি করদাতা নাগরিকের উপরও।
কী ঘটেছে
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালের সরকারি ক্রয় আইন এবং পরবর্তী বিধিমালার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো, যা সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন আইনে যেসব পরিবর্তন এসেছে
উদ্দেশ্যের পরিধি বৃদ্ধি
আগের আইনে মূল জোর ছিল কেবল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার উপর। সংশোধিত আইনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থের বিপরীতে সর্বোত্তম মূল্য (best value for money), দক্ষতা, নৈতিকতা, মান ও টেকসই ক্রয়ের (sustainable procurement) নীতি।
ই-জিপি পোর্টাল বাধ্যতামূলক
এখন থেকে সব সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যতিক্রম প্রয়োজন হলে তার জন্য বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA)-র পূর্বানুমোদন লাগবে।
রিভার্স অকশন পদ্ধতি
প্রথমবারের মতো আইনে যুক্ত হয়েছে রিভার্স অকশন বা বিপরীতমুখী নিলাম পদ্ধতি — এখানে সরবরাহকারীরা রিয়েল-টাইমে একে অপরের চেয়ে কম দামে কাজ পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেন, যা মূল্য কমিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
বিপিপিএ-র ভূমিকা সুসংহতকরণ
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি "ফিজিক্যাল সার্ভিসেস" নামে ক্রয়ের একটি নতুন পৃথক শ্রেণিও যুক্ত হয়েছে।
ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্টের পরিধি বৃদ্ধি
একাধিক সরকারি সংস্থা এখন পূর্বনির্বাচিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সাধারণভাবে ব্যবহৃত পণ্য একসঙ্গে কিনতে পারবে, যা সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষা
বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রযুক্তি-সেবা খাতে এখন থেকে একটি স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যৌথ অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই সংস্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি ক্রয় খাত সবসময়ই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে, কারণ এখানে জড়িত থাকে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ। ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং রিভার্স অকশনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি চালু করার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের হস্তক্ষেপ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও যাচাইযোগ্য একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পৌঁছাতে পারে সাধারণ নাগরিকের কাছেও — রাস্তাঘাট, হাসপাতাল বা স্কুলের মতো সরকারি প্রকল্প যদি সঠিক মূল্যে ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়, তার সরাসরি সুবিধাভোগী জনগণই।
প্রভাব কাদের উপর পড়বে
- সরকারি টেন্ডারে অংশ নেওয়া নির্মাণ, সরবরাহ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান
- তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান
- বৈদেশিক অর্থায়নে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যাদের এখন স্থানীয় অংশীদার নিতে হবে
- পরোক্ষভাবে — সাধারণ নাগরিক, যারা সরকারি সেবা ও অবকাঠামোর সুবিধাভোগী
যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি দরপত্রে অংশ নেয়, তাদের জন্য এখন ই-জিপি পোর্টালে নিবন্ধন ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য রাখা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন বিধিমালা ও প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নের বিস্তারিত পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে।

মন্তব্যসমূহ (০)