১৯২৮ সালে স্কটল্যান্ডের একটি ক্যাফেতে এক নারীর বন্ধু তাঁর জন্য একটি জিঞ্জার বিয়ারের বোতল কিনে দেন। বোতলটি ছিল অস্বচ্ছ। কিছুটা পান করার পর অবশিষ্ট পানীয় ঢালতে গিয়ে বোতল থেকে একটি পচা শামুকের অবশেষ বেরিয়ে আসে বলে অভিযোগ। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সমস্যা হলো, তিনি নিজে বোতলটি কেনেননি, তাই বিক্রেতা বা প্রস্তুতকারকের সঙ্গে তাঁর কোনো চুক্তি ছিল না। তাহলে তিনি কি প্রস্তুতকারকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ১৯৩২ সালে হাউস অব লর্ডসের রায় Donoghue v Stevenson আধুনিক অবহেলা আইনের ভিত্তি তৈরি করে।
Negligence কী
টর্ট আইনে negligence বা অবহেলা হলো এমন যত্ন অবলম্বনে ব্যর্থতা, যা একজন যুক্তিসংগত ব্যক্তি একই পরিস্থিতিতে অবলম্বন করতেন, এবং যার ফলে অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হন যাঁর প্রতি সেই যত্নের দায়িত্ব ছিল। ইংরেজি মামলা Blyth v Birmingham Waterworks (1856)-এ অবহেলাকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন কিছু না করা হিসেবে, যা একজন যুক্তিসংগত মানুষ করতেন, অথবা এমন কিছু করা হিসেবে, যা একজন বিচক্ষণ ও যুক্তিসংগত মানুষ করতেন না।
অবহেলা প্রতিষ্ঠার জন্য বাদীকে সাধারণত চারটি উপাদান প্রমাণ করতে হয়।
উপাদান ১: যত্নের দায়িত্ব (duty of care)
প্রথম প্রশ্ন হলো, বিবাদীর কি বাদীর প্রতি যত্নের আইনগত দায়িত্ব ছিল?
Neighbour principle
Donoghue v Stevenson-এ লর্ড অ্যাটকিন বলেন, যে কাজ বা বিরতি থেকে আপনার "প্রতিবেশী"র ক্ষতি হতে পারে বলে যুক্তিসংগতভাবে অনুমান করা যায়, তা এড়াতে আপনাকে যুক্তিসংগত যত্ন নিতে হবে। আর আইনের দৃষ্টিতে প্রতিবেশী হলেন তাঁরা, যাঁরা আপনার কাজে এত ঘনিষ্ঠ ও সরাসরি প্রভাবিত হন যে কাজটি করার সময় তাঁদের কথা আপনার যুক্তিসংগতভাবে ভাবা উচিত। এর ভিত্তিতে আদালত বলেন, প্রস্তুতকারকের চূড়ান্ত ভোক্তার প্রতি যত্নের দায়িত্ব আছে, চুক্তি না থাকলেও।
Caparo পরীক্ষা
পরবর্তীতে Caparo Industries v Dickman (1990) মামলায় নতুন ধরনের পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নির্ণয়ের জন্য তিন ধাপের পরীক্ষা প্রবর্তিত হয়:
- ক্ষতি যুক্তিসংগতভাবে অনুমানযোগ্য ছিল কি না;
- পক্ষদের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা (proximity) ছিল কি না;
- দায়িত্ব আরোপ করা ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও ন্যায়সংগত কি না।
উপাদান ২: দায়িত্ব লঙ্ঘন (breach of duty)
দায়িত্ব থাকলে প্রশ্ন হলো, বিবাদী কি প্রত্যাশিত মানের যত্ন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন? মানদণ্ড বস্তুনিষ্ঠ: একজন যুক্তিসংগত ব্যক্তি একই পরিস্থিতিতে কী করতেন। আদালত সাধারণত বিবেচনা করেন:
- ক্ষতির সম্ভাবনা কতটা বেশি ছিল;
- সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা গুরুতর;
- সতর্কতা নেওয়ার খরচ ও বাস্তবতা;
- বিবাদীর কাজের সামাজিক উপযোগিতা।
পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে মানদণ্ড হলো সেই পেশার একজন যুক্তিসংগত দক্ষ সদস্যের মান। চিকিৎসা অবহেলার ক্ষেত্রে Bolam v Friern Hospital Management Committee (1957) মামলার পরীক্ষা বহুল পরিচিত।
Res ipsa loquitur
কিছু ক্ষেত্রে ঘটনার ধরন দেখেই অবহেলার অনুমান করা যায়—"ঘটনা নিজেই কথা বলে"। যেমন গুদামের ওপর থেকে পথচারীর মাথায় চিনির বস্তা পড়া (Scott v London and St Katherine Docks, 1865)। শর্ত হলো, জিনিসটি বিবাদীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং স্বাভাবিক অবস্থায় যত্ন নিলে এমন ঘটনা ঘটে না। তখন বিবাদীকে ব্যাখ্যা দিতে হয়।
উপাদান ৩: কার্যকারণ (causation)
প্রকৃত কারণ: "but for" পরীক্ষা
বিবাদীর অবহেলা না থাকলে কি ক্ষতি ঘটত? ঘটলে কার্যকারণ প্রমাণ হয় না। Barnett v Chelsea and Kensington Hospital (1969)-এ হাসপাতাল রোগীকে পরীক্ষা না করেই ফেরত পাঠায়, যা অবহেলা। কিন্তু রোগী এমন বিষক্রিয়ায় মারা যান, যা সময়মতো চিকিৎসা দিলেও সম্ভবত ঠেকানো যেত না। তাই হাসপাতাল দায়ী হয়নি।
আইনগত কারণ ও দূরবর্তিতা (remoteness)
ক্ষতিটি অবহেলার যুক্তিসংগতভাবে অনুমানযোগ্য ধরনের হতে হবে। The Wagon Mound (No 1) (1961)-এ প্রিভি কাউন্সিল বলেন, অনুমানযোগ্য নয় এমন ধরনের ক্ষতির জন্য বিবাদী দায়ী নন।
উপাদান ৪: ক্ষতি (damage)
অবহেলার টর্ট সাধারণত প্রকৃত ক্ষতি ছাড়া মামলাযোগ্য নয়। শারীরিক আঘাত, সম্পত্তির ক্ষতি এবং তা থেকে উদ্ভূত আর্থিক ক্ষতি স্বীকৃত। নিছক আর্থিক ক্ষতি (pure economic loss) ও মানসিক আঘাতের ক্ষেত্রে আদালত তুলনামূলক সতর্ক এবং অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করেন।
প্রধান প্রতিরক্ষা
- বাদীর নিজের অবহেলা (contributory negligence): বাদীর নিজের অসতর্কতাও ক্ষতিতে ভূমিকা রাখলে ক্ষতিপূরণ কমতে পারে বা কিছু ব্যবস্থায় বাতিলও হতে পারে।
- স্বেচ্ছায় ঝুঁকি গ্রহণ (volenti non fit injuria): বাদী জেনেশুনে ও স্বেচ্ছায় ঝুঁকি মেনে নিলে।
- অনিবার্য দুর্ঘটনা: যুক্তিসংগত যত্ন নিয়েও যা এড়ানো যেত না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে টর্ট আইন মূলত বিধিবদ্ধ নয়, আর অবহেলার নীতিগুলো ইংরেজ কমন ল থেকে আসা। কিছু বিধিবদ্ধ আইনও প্রাসঙ্গিক, যেমন মারাত্মক দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত Fatal Accidents Act, 1855 এবং পণ্য বা সেবায় ক্ষতির ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯। ভোক্তার প্রতিকারের দিক নিয়ে পড়ুন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ভোক্তার অধিকার। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে রিট এখতিয়ারে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও আদালতে এসেছে।
পেশাগত অবহেলার একটি বাস্তব দিক—আইনজীবীর দায়—নিয়ে আছে আইনজীবীর দায়বদ্ধতা: মক্কেলের প্রতি কর্তব্য অবহেলার আইনগত পরিণতি লেখায়। নিয়োগকর্তার দায়ের প্রশ্ন জানতে পড়ুন টর্ট আইনে Vicarious Liability।
পরীক্ষায় উত্তর লেখার কাঠামো
- সংজ্ঞা ও Blyth-এর বর্ণনা।
- চার উপাদান, প্রতিটিতে নজির।
- Donoghue v Stevenson-এর ঘটনা ও neighbour principle বিস্তারিত।
- Res ipsa loquitur।
- প্রতিরক্ষা।
- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।
- উপসংহার।
উপসংহার
একটি বোতলের ভেতরের শামুকের অভিযোগ থেকে জন্ম নেওয়া neighbour principle আজ পণ্য প্রস্তুতকারক থেকে চিকিৎসক, চালক থেকে প্রতিষ্ঠান—সবার দায়ের ভিত্তি। দায়িত্ব, লঙ্ঘন, কার্যকারণ ও ক্ষতি—এই চার উপাদানের যুক্তিসংগত বিশ্লেষণই অবহেলার যেকোনো প্রশ্নের উত্তরের মূল কাঠামো।

মন্তব্যসমূহ (০)