ব্যবসা থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া বা চাকরির নিয়োগ — দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য লেনদেন আসলে একেকটি চুক্তি। কিন্তু মৌখিক বা লিখিত প্রতিশ্রুতি সবসময় আইনের চোখে "চুক্তি" হিসেবে গণ্য হয় না। কনট্র্যাক্ট অ্যাক্ট, ১৮৭২ অনুযায়ী একটি সমঝোতা তখনই আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য চুক্তি হয়ে ওঠে, যখন তা নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ করে।
বৈধ চুক্তির অপরিহার্য উপাদান
চুক্তি আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, স্বাধীন সম্মতিতে সম্পাদিত, চুক্তি করার যোগ্যতাসম্পন্ন পক্ষগুলোর মধ্যে বৈধ প্রতিদান ও বৈধ উদ্দেশ্যে সম্পাদিত সমঝোতাই আইনগত চুক্তি হিসেবে গণ্য হয়।
প্রস্তাব ও গ্রহণ (অফার ও অ্যাকসেপ্টেন্স)
একপক্ষের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এবং অপরপক্ষের শর্তহীন গ্রহণ — এই দুটি ছাড়া কোনো চুক্তি তৈরি হয় না।
প্রতিদান (কনসিডারেশন)
প্রতিটি পক্ষকে বিনিময়ে কিছু না কিছু দিতে হয় — টাকা, সেবা বা পণ্য। বিনামূল্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সাধারণত আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য চুক্তি নয়।
চুক্তি করার যোগ্যতা
প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের বেশি), সুস্থ মস্তিষ্কের এবং আইন দ্বারা অযোগ্য ঘোষিত নন এমন ব্যক্তিই চুক্তি করার যোগ্যতা রাখেন। নাবালকের সঙ্গে করা চুক্তি সাধারণত অকার্যকর (void) বলে বিবেচিত হয়।
স্বাধীন সম্মতি
জবরদস্তি, অযাচিত প্রভাব, প্রতারণা, ভুল বোঝাবুঝি বা মিথ্যা বিবৃতির মাধ্যমে আদায় করা সম্মতি "স্বাধীন সম্মতি" নয় — এমন চুক্তি বাতিলযোগ্য (voidable) হতে পারে।
বৈধ উদ্দেশ্য
চুক্তির উদ্দেশ্য বা বিষয়বস্তু বেআইনি, জনস্বার্থবিরোধী বা প্রতারণামূলক হলে তা আইনের চোখে অকার্যকর।
মৌখিক চুক্তি কি বৈধ?
হ্যাঁ, বাংলাদেশের আইনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৌখিক চুক্তিও বৈধ, তবে বিরোধ হলে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জমি হস্তান্তর বা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আইন লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বাধ্যতামূলক করে। তাই বড় অঙ্কের বা দীর্ঘমেয়াদি লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তিই সবচেয়ে নিরাপদ।
চুক্তি ভঙ্গ হলে কী প্রতিকার পাওয়া যায়
- ক্ষতিপূরণ (ড্যামেজেস): চুক্তি ভঙ্গের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
- নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন (স্পেসিফিক পারফরম্যান্স): কিছু ক্ষেত্রে আদালত অপর পক্ষকে চুক্তির শর্ত মোতাবেক কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য করতে পারে, বিশেষত যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট প্রতিকার নয়।
- চুক্তি বাতিল (রেসিশন): ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চুক্তিটি বাতিল ঘোষণা করে নিজের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হতে পারেন।
- বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: মামলার আগে সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমেও বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়, যা সময় ও খরচ দুটোই বাঁচায়।
ব্যবহারিক পরামর্শ
গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো লেনদেনে চুক্তির শর্তাবলি স্পষ্টভাবে লিখিত রাখা, উভয় পক্ষের স্বাক্ষর নেওয়া এবং সম্ভব হলে সাক্ষী রাখা ভবিষ্যতের বিরোধ এড়াতে সাহায্য করে। চুক্তির অঙ্ক বড় হলে বা শর্তাবলি জটিল হলে সম্পাদনের আগে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করিয়ে নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয়। দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়েরের প্রাথমিক ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন দেওয়ানি মামলা দায়ের করার প্রাথমিক নিয়ম।

মন্তব্যসমূহ (০)