গ্রেপ্তার বা রিমান্ডের সময় একজন নাগরিকের কী অধিকার আছে তা নিয়ে BD Laws Daily-তে আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে — পড়ুন গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নাগরিকের অধিকার। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরের ধাপ — অর্থাৎ প্রকৃত বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন — একজন আসামির কী কী আইনগত সুরক্ষা থাকে, তা নিয়ে আলাদাভাবে জানা জরুরি। বিচারাধীন থাকা মানেই দোষী প্রমাণিত হওয়া নয় — আর ঠিক এই কারণেই আইন আসামিকে নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর কিছু সুনির্দিষ্ট সুযোগ দেয়।
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ: বিচার ও শাস্তি সংক্রান্ত সুরক্ষা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক সুরক্ষার কথা বলা আছে —
- কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার সময় তা আইনে অপরাধ না হলে, পরবর্তীতে নতুন আইন করে তাকে অপরাধ বলে শাস্তি দেওয়া যাবে না (৩৫(১))।
- একই অপরাধের জন্য একাধিকবার বিচার বা শাস্তি দেওয়া যাবে না — দ্বৈত শাস্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষা (৩৫(২))।
- প্রতিটি অভিযুক্তের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার আছে (৩৫(৩))।
- কোনো অভিযুক্তকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে বাধ্য করা যাবে না — আত্মপক্ষে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য না হওয়ার সুরক্ষা (৩৫(৪))।
- কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা লাঘবকর শাস্তি বা আচরণের শিকার করা যাবে না (৩৫(৫))।
নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের অধিকার
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৩৪০(১) ধারা অনুযায়ী, ফৌজদারি আদালতে অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির অধিকার আছে নিজের পছন্দমতো একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থন করার। এটি বিচার প্রক্রিয়ার একেবারে মৌলিক একটি সুরক্ষা — আসামিকে একা প্রসিকিউশনের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায় না।
বিচারের সময় নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এবং আসামিপক্ষের সাক্ষ্য শুরুর আগে আদালত আসামিকে সাধারণভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে, যাতে তিনি মামলার বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পান। এই জিজ্ঞাসাবাদ শপথের অধীনে হয় না, এবং আসামি জবাব দিতে অস্বীকার করলে বা মিথ্যা জবাব দিলে সরাসরি শাস্তি পাবেন না — তবে আদালত পরিস্থিতি অনুযায়ী এ থেকে অনুমান টানতে পারে, আর তার জবাব প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্বীকারোক্তি সংক্রান্ত সুরক্ষা
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এ আসামির স্বীকারোক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুরক্ষা আছে। ২৫ ধারা অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া কোনো স্বীকারোক্তি আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ২৬ ধারা অনুযায়ী পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় দেওয়া স্বীকারোক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না তা সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেওয়া হয়। তবে ২৭ ধারায় একটি সীমিত ব্যতিক্রম আছে — পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যদি নতুন কোনো তথ্য বা বস্তু আবিষ্কৃত হয়, তাহলে শুধু সেই আবিষ্কৃত অংশটুকু প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী নয়
"নিরপরাধিতার অনুমান" (Presumption of Innocence) নীতিটি বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃত — অর্থাৎ প্রসিকিউশনকেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয় যে আসামি অপরাধ করেছেন, আসামিকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হয় না। এটি কোনো একক নির্দিষ্ট ধারায় সংজ্ঞায়িত না হলেও বিচারিক ব্যাখ্যা ও আইনি চর্চায় এটি একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য।
অভিযোগ ও সাক্ষ্য যাচাইয়ের সুযোগ
একটি ফৌজদারি বিচারে আসামিকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ (চার্জ) জানানো হয়, প্রসিকিউশনের প্রতিটি সাক্ষীকে জেরা (cross-examination) করার সুযোগ দেওয়া হয়, এবং আসামিপক্ষ নিজস্ব সাক্ষী বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে। বিচারের এই কাঠামোই নিশ্চিত করে যে একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা
আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকলে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ অনুযায়ী জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (NLASO)-র মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়া যায়। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত আর্থিকভাবে অসচ্ছল কোনো ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগের একটি পুরনো বিধানও Legal Remembrancer's Manual, ১৯৬০-এ রয়েছে।
এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত অধিকারগুলো সাধারণ আইনি কাঠামোর একটি পরিচিতি মাত্র — কোনো নির্দিষ্ট মামলায় এগুলোর প্রয়োগ কেমন হবে তা নির্ভর করে সেই মামলার নিজস্ব তথ্য-উপাত্তের ওপর। তাই বাস্তব পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর সরাসরি পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।

মন্তব্যসমূহ (০)