খুনের মামলায় একজন সাক্ষী আদালতে বললেন, "আমি নিজে কিছু দেখিনি, তবে আমার প্রতিবেশী আমাকে বলেছেন যে আসামি ছুরি হাতে দৌড়ে যাচ্ছিল।" এই বক্তব্য দিয়ে কি প্রমাণ হয় যে আসামি ছুরি হাতে দৌড়াচ্ছিল? সাধারণ নিয়মে, না। কারণ এটি hearsay, অর্থাৎ শোনা কথার সাক্ষ্য। সাক্ষ্য আইনের এই মৌলিক নীতি পরীক্ষায় প্রায় প্রতি বছরই আসে, আর আদালতের বাস্তব কাজেও বারবার প্রাসঙ্গিক হয়।
Hearsay কী
যখন কোনো সাক্ষী আদালতে এমন একটি বিবৃতির কথা বলেন, যা অন্য কেউ আদালতের বাইরে করেছিলেন, এবং সেই বিবৃতি উপস্থাপন করা হয় বিবৃতিতে বলা বিষয়টির সত্যতা প্রমাণের জন্য—তখন তা hearsay। মূল শর্ত হলো উদ্দেশ্য। বিবৃতিটি সত্য প্রমাণ করতে চাওয়া হচ্ছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
এই পার্থক্যটি প্রিভি কাউন্সিলের Subramaniam v Public Prosecutor (1956) মামলায় স্পষ্ট হয়। অভিযুক্ত বলেছিলেন, সন্ত্রাসীরা তাঁকে হুমকি দিয়েছিল। এই হুমকির কথাগুলো সত্য কি না তা প্রমাণের জন্য নয়, বরং অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা দেখাতে—অর্থাৎ হুমকি দেওয়া হয়েছিল এই তথ্য প্রমাণ করতে—উপস্থাপিত হলে সেটি hearsay নয়। আদালত বলেন, বিবৃতি করা হয়েছিল কি না তা প্রমাণ করা আর বিবৃতির বিষয়বস্তু সত্য কি না তা প্রমাণ করা—দুটি আলাদা বিষয়।
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬০ ধারা
বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে "hearsay" শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু ৬০ ধারায় বলা হয়েছে, মৌখিক সাক্ষ্য সব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ (direct) হতে হবে:
- কোনো কিছু দেখা গেছে বলে দাবি করলে, যিনি নিজে দেখেছেন তাঁর সাক্ষ্য।
- শোনা গেছে বলে দাবি করলে, যিনি নিজে শুনেছেন তাঁর সাক্ষ্য।
- অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা গেছে বলে দাবি করলে, যিনি নিজে অনুভব করেছেন তাঁর সাক্ষ্য।
- মতামত হলে, যিনি সেই মত পোষণ করেন তাঁর সাক্ষ্য।
এর মাধ্যমেই hearsay সাধারণভাবে বর্জিত। ৬০ ধারায় বিশেষজ্ঞের মতামত সংক্রান্ত কিছু শর্তসাপেক্ষ বিধানও আছে। মূল পাঠ দেখতে পারেন bdlaws.minlaw.gov.bd-এ।
Hearsay কেন বর্জন করা হয়
- শপথ নেই: মূল বক্তা আদালতে শপথ নিয়ে কথা বলেননি।
- জেরার সুযোগ নেই: প্রতিপক্ষ মূল বক্তার স্মৃতি, দৃষ্টিশক্তি, সততা বা পক্ষপাত পরীক্ষা করতে পারেন না। জেরা (cross-examination) সত্য উদ্ঘাটনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
- আচরণ পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়: বিচারক মূল বক্তার আচরণ দেখে বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে পারেন না।
- বিকৃতির ঝুঁকি: কথা এক মুখ থেকে আরেক মুখে গেলে অর্থ বদলে যেতে পারে।
- দায়হীনতা: আদালতের বাইরে বলা কথার জন্য মিথ্যা সাক্ষ্যের দায় আরোপ করা কঠিন।
- বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি: অসংখ্য শোনা কথা গ্রহণ করলে বিচার প্রক্রিয়া অপ্রাসঙ্গিক তথ্যে ভারী হয়ে যায়।
প্রধান ব্যতিক্রমসমূহ
কঠোরভাবে hearsay বর্জন করলে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য হারিয়ে যেত। তাই সাক্ষ্য আইনে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
১. Res gestae (ধারা ৬)
ঘটনার অংশ হিসেবে, ঘটনার সময় বা অব্যবহিত পরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলা কথা প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যুক্তি হলো, এমন মুহূর্তে বানিয়ে বলার সময় থাকে না। যেমন আক্রান্ত ব্যক্তি আঘাতের মুহূর্তে চিৎকার করে আক্রমণকারীর নাম বললেন। শর্ত হলো ঘটনা ও বক্তব্যের মধ্যে সময়ের ঘনিষ্ঠতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা।
২. স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তি (ধারা ১৭–৩১)
মামলার পক্ষ নিজের বিরুদ্ধে যা স্বীকার করেছেন (admission), তা তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির (confession) ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আছে। যেমন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণত তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যায় না। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তি রেকর্ডের প্রক্রিয়া নিয়ে পড়ুন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা লেখায়।
৩. যাঁকে সাক্ষী হিসেবে আনা সম্ভব নয় তাঁর বিবৃতি (ধারা ৩২)
মৃত, খুঁজে পাওয়া যায় না, সাক্ষ্য দিতে অক্ষম, অথবা যাঁকে আনতে অযৌক্তিক বিলম্ব বা ব্যয় হবে—এমন ব্যক্তির কিছু বিবৃতি নির্দিষ্ট শর্তে প্রাসঙ্গিক। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মৃত্যুকালীন ঘোষণা (dying declaration): মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে মৃত ব্যক্তির বিবৃতি [ধারা ৩২(১)]। বিস্তারিত দেখুন Dying Declaration কী এবং এর সাক্ষ্যগত মূল্য। এ ছাড়া ব্যবসার স্বাভাবিক ধারায় করা লিখিত বিবরণ বা নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে করা বিবৃতিও এই ধারার আওতায় আসতে পারে।
৪. পূর্ববর্তী কার্যধারার সাক্ষ্য (ধারা ৩৩)
আগের কোনো বিচারিক কার্যধারায় দেওয়া সাক্ষ্য পরবর্তী কার্যধারায় নির্দিষ্ট শর্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। শর্তের মধ্যে আছে সাক্ষীকে পাওয়া না যাওয়া, পক্ষদের মিল এবং আগের কার্যধারায় জেরার সুযোগ থাকা।
৫. সরকারি রেকর্ড ও নির্দিষ্ট লিখিত বিবরণ (ধারা ৩৪–৩৮)
সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনকালে করা রেকর্ডের এন্ট্রি, নির্দিষ্ট মানচিত্র, প্রকাশিত আইন সংক্রান্ত বিবরণী ইত্যাদি নির্দিষ্ট শর্তে প্রাসঙ্গিক। যুক্তি হলো, দায়িত্বের অংশ হিসেবে করা রেকর্ডে নির্ভরযোগ্যতার একটি অন্তর্নিহিত নিশ্চয়তা থাকে।
Hearsay নয়, কিন্তু প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে
- বিবৃতি করা হয়েছিল কি না, তা প্রমাণ: যেমন মানহানির মামলায় অভিযুক্ত আসলে কী বলেছিলেন। এখানে কথাটি সত্য কি না প্রশ্ন নয়, বলা হয়েছিল কি না সেটাই প্রশ্ন।
- সাক্ষীর আগের বিবৃতি দিয়ে সমর্থন (ধারা ১৫৭): সাক্ষীর আদালতের সাক্ষ্য সমর্থন করতে তাঁর আগের বিবৃতি ব্যবহার। এটি স্বাধীন প্রমাণ নয়, সমর্থনমূলক।
সমস্যাভিত্তিক উদাহরণ
চুরির মামলায় দোকানের কর্মচারী সাক্ষ্য দিলেন: "দোকানের মালিক আমাকে ফোনে বলেছেন যে তিনি আসামিকে টাকা নিতে দেখেছেন।" মালিক জীবিত ও সাক্ষ্য দিতে সক্ষম। কর্মচারীর সাক্ষ্য hearsay, কারণ এটি মালিকের দেখা ঘটনার সত্যতা প্রমাণে উপস্থাপিত এবং কোনো ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে না। প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের জন্য মালিককেই আদালতে আসতে হবে।
পরীক্ষায় উত্তর লেখার কাঠামো
- সংজ্ঞা এবং "উদ্দেশ্য"-এর পরীক্ষা (Subramaniam)।
- ৬০ ধারার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের নিয়ম।
- বর্জনের কারণ।
- ব্যতিক্রমগুলো ধারা নম্বরসহ, প্রতিটির যুক্তি।
- একটি উদাহরণ।
- উপসংহার।
প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার মৌলিক পার্থক্য বুঝে নিলে hearsay আরও স্পষ্ট হয়। দেখুন Relevancy ও Admissibility-এর মধ্যে পার্থক্য।
উপসংহার
Hearsay নিয়মের মূলে আছে জেরার মাধ্যমে সত্য যাচাইয়ের প্রতি আস্থা। যে কথা পরীক্ষা করা যায় না, তার ওপর কারও স্বাধীনতা বা সম্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আবার যেখানে পরিস্থিতিই নির্ভরযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে আইন ব্যতিক্রম রেখেছে। নিয়ম ও ব্যতিক্রমের এই ভারসাম্য বুঝলেই hearsay আয়ত্তে আসে।

মন্তব্যসমূহ (০)