জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ পরীক্ষা করে জাতীয় সংসদে প্রতিবেদন দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দুটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিলগুলোর কিছু বিধান নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে।
কী ঘটেছে
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পর্যালোচনা করে বেশ কিছু সংশোধনসহ বিলটি সংসদে পাসের সুপারিশ করেছে। কমিটির প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে — কমিশনকে ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদ ও কোনো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে থাকা "উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে" শর্তটি বাদ দেওয়া, কমিশনে একজন নারী কমিশনারের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে একজন সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব, এবং কমিশনের বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি অথবা মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো সাংবাদিককে যুক্ত করার সুপারিশ। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পরীক্ষা করে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তনের সুপারিশ করেনি।
কবে ও কোথায় ঘটেছে
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী। কমিটি দুটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের পর বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ও বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) অধিবেশনে বিলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্য
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম অভিযোগ করেন, বিলের কিছু বিধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে এবং গুম বা নির্যাতনের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়বদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বিলে নেই বলে তিনি দাবি করেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন আইনটি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী — ভুক্তভোগীরা কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারবেন, এবং অভিযুক্তের সম্পদ না থাকলেও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব সরকার নেবে। এ ছাড়া কমিটি গঠন ও বৈঠক বর্জন নিয়েও সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় — বিরোধী দলের দাবি, প্রতিবেদনে তাদের "সক্রিয় অংশগ্রহণ" উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে বিস্তারিত আলোচনার আগেই তারা ওয়াকআউট করেছিল, এবং এ বিষয়ে তাদের লিখিত ভিন্নমত রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানায় তারা। ডেপুটি স্পিকার জানান, ধারাওয়ারি বিতর্কের সময় বিষয়টি সুরাহা করা হবে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে এখনো স্বাধীন, শক্তিশালী তদন্ত-ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার আইন কার্যকর নেই বলে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করে আসছে। কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ভর করে তার তদন্ত ক্ষমতা, সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং অর্থায়নের ওপর — এ কারণেই কমিটির সুপারিশকৃত পরিবর্তনগুলো (অনুমোদন-শর্ত বাতিল, বাছাই কমিটিতে স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব) গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলটি একটি দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন, বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিয়ে সরকারি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে। সংবিধানের মৌলিক অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন সংবিধানের মৌলিক অধিকার: কাগজে যতটা শক্তিশালী, বাস্তবে ততটা কার্যকর কি?।
এর প্রভাব কী
কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপিত হলেও বিল দুটির চূড়ান্ত পাস আপাতত মুলতবি রয়েছে; ধারাওয়ারি (ক্লজ-বাই-ক্লজ) বিতর্ক শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কমিশনের ক্ষমতা ও গঠন সংশোধিত হলে তা বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হতে পারে। নাগরিকদের জন্য এই বিলগুলোর চূড়ান্ত রূপ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো ভবিষ্যতে অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের প্রাতিষ্ঠানিক পথ নির্ধারণ করবে।

মন্তব্যসমূহ (০)