জাতীয় সংসদ সম্প্রতি পাস করেছে শ্রম আইন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ — গত কয়েক দশকের মধ্যে শ্রম আইনে অন্যতম বড় সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এটি। এই সংশোধনী মূলত ২০২৫ সালের নভেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত একটি অধ্যাদেশের ভিত্তিতে তৈরি, যা পরে সংসদে বিল আকারে পাস হয়। বেসরকারি খাতের কোটি কোটি শ্রমিকের জন্য এই পরিবর্তনগুলো সরাসরি প্রাসঙ্গিক।
কী পরিবর্তন এসেছে
- পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বেড়ে ১২০ দিন
- ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করে সদস্যসংখ্যাভিত্তিক করা
- শ্রমিক কালো তালিকাভুক্তি ও নিয়োগকর্তা-নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন নিষিদ্ধকরণ
- দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণে পৃথক তহবিল ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ গঠন
- বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ থেকে বেড়ে ১৩ দিন
মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি
নারী শ্রমিকদের জন্য পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। এই সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট নারী শ্রমিককে প্রসবের প্রত্যাশিত তারিখের আগে একই প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৬ মাস কর্মরত থাকতে হবে। উল্লেখযোগ্য একটি শর্ত হলো — যাদের ইতিমধ্যে দুই বা তার বেশি জীবিত সন্তান আছে, তাদের ক্ষেত্রে পূর্ণ ১২০ দিনের সুবিধা প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের নিয়ম সহজ করা
আগে একটি প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশের সম্মতি প্রয়োজন হতো। নতুন আইনে এই নিয়ম প্রতিস্থাপিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের আকারভিত্তিক নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য দিয়ে — যেমন ২০ থেকে ৩০০ জন শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে মাত্র ২০ জন সদস্য হলেই ইউনিয়ন গঠন করা যাবে, আর ৩ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন হবে ৪০০ জন। এতে ইউনিয়ন গঠন আগের চেয়ে সহজ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শ্রমিক সুরক্ষায় নতুন বিধান
নিয়োগকর্তাদের জন্য এখন সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে — শ্রমিক বা ইউনিয়ন সদস্যদের কালো তালিকাভুক্ত করা, নিয়োগকর্তা-নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন গঠন করা কিংবা ইউনিয়নের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া। পাশাপাশি জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ তহবিল ও বিরোধ নিষ্পত্তি
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে একটি পৃথক ওয়ার্কপ্লেস অ্যাক্সিডেন্ট কম্পেনসেশন ফান্ড। শ্রমিক-মালিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষও (Alternative Dispute Resolution Authority) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
উৎসব ছুটি বৃদ্ধি
বার্ষিক উৎসব ছুটির সংখ্যা ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট: কেন এই সংস্কার
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হালনাগাদ করার দাবি জানিয়ে আসছিল, বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও কর্মপরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে। ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়নের মতো আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এই সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছে।
শ্রমিক ও মালিকপক্ষের জন্য এর অর্থ কী
শ্রমিকদের জন্য এই সংশোধনী মানে দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি, সহজে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা। অন্যদিকে মালিকপক্ষ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের এখন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা, রেজিস্টার ও প্রক্রিয়া নতুন আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে হালনাগাদ করতে হবে।
নতুন আইনের বিস্তারিত প্রয়োগবিধি সংক্রান্ত বিধিমালা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে। শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠান — উভয় পক্ষেরই উচিত হালনাগাদ শ্রম বিধিমালা নিয়মিত অনুসরণ করা।

মন্তব্যসমূহ (০)